জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলাটি তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান বলেন, সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
রোববার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের উল্টোদিকের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ।
এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সোমবার গাজী নজরুল ইসলামের চার দিনের এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের একদিনে রিমান্ড মঞ্জুর করে পুলিশ। এখন তাদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে ডিবি পুলিশ।
মামলার এজাহারে মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেছেন, গত জুনে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের ‘প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়’ সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে বাদীর বড় মেয়ে মরিয়মের (১৯) বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর বাসায় নজরুল ও মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম।
এজাহারে বলা হয়, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তার পরিবারকে বলে গেছেন। এর মধ্যে রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল মোবাইল ফোনে বাদীকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে মরিয়মকে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখেন বাবা মাসুম বিল্লাহ।
তিনি এজাহারে লিখেছেন, লাশ উদ্ধারের সময় মেয়ের বিছানার ওপরে তার লেখা ‘সুইসাইড নোট’ দেখতে পান।
একটি চিরকুটে লেখা আছে, শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।
আরেকটিতে লেখা, আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।
আরেকটি চিরকুটে আছে দুটি লেখা। একটিতে আছে, সে ছিলো অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!
অপর লেখায় আছে, কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশির সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়…ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!
রোববার বিকাল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে মরিয়ম আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে এজাহারে বলা হয়েছে।
সাতক্ষীরায় গভীর রাতে মরিয়মের দাফন : সাতক্ষীরার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা গ্রাম, ২০০৯ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় আইলার পর সে গ্রাম ছেড়েছিল মরিয়মের বাবা-মা। মৃত্যুর পর সেই গাবুরাতেই চিরশায়িত হলেন সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম।
সোমবার রাত ১টার দিকে গাবুরা ইউনিয়নের সরদার পাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয় বলে জানিয়েছেন শ্যামনগর থানার এসআই অনিরুদ্ধ রায়।
সোমবার রাত ১টার দিকে গাবুরা ইউনিয়নের সরদার পাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয় বলে জানিয়েছেন শ্যামনগর থানার এসআই অনিরুদ্ধ রায়।
ঢাকায় ময়নাতদন্তসহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে অ্যাম্বুলেন্সে করে সোমবার মরিঢমের মরদেহ সাতক্ষীরায় আনা হয়। পরে রাত প্রায় ১১টার দিকে কপোতাক্ষ নদ পেরিয়ে ট্রলারে করে মরিয়মের মরদেহ গাবুরার সরদার পাড়ায় পৌঁছায়।
মরিয়মের মরদেহের সঙ্গে ছিলেন তার বাবা মাসুম বিল্লাহ, মা, দাদি, নানি, ফুপা, ফুপি ও ছোট চাচা মোতাসিম বিল্লাহসহ স্বজনরা।
মরদেহ পৌঁছানোর পর গাবুরা পশ্চিমপাড়া সরদার বাড়ি জামে মসজিদের পাশে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা নুরুল হুদা তাতে ইমামতি করেন।
এতে স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা এবং শ্যামনগর থানার এসআই অনিরুদ্ধ রায় ও বদিউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
জানাজায় ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা মরিয়মের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন এবং তার জন্য দোয়া করতে উপস্থিতদের প্রতি আহ্বান জানান।
দাফনের আগে স্বজনরা মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান। তাদের ভাষ্য, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
মরিয়মের বড় চাচি মুন্নী আক্তার বলেন, আমাদের মেয়ে খুবই নরম ও ভদ্র ছিল। অনেক মেধাবী ছিল। জানি না এটা কেন ঘটেছে। মৃত্যুর রহস্য এখনো জানা যায়নি। ওর সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, আমরা তার সুষ্ঠু বিচার চাই।
মরিয়মের স্বজন ইয়াহিয়া বলেন, রোববার রাত ৭টার দিকে জানতে পারি মরিয়ম নাকি আত্মহত্যা করেছে। তবে প্রকৃত ঘটনা তো আমরা জানি না। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
মরিয়মের জন্মভূমি চৌদ্দরশি গ্রামে এখন পরিবারের কেউ স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না। তবে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে শোক ও উদ্বেগ দেখা যায়।
তবে গভীর রাতে পুলিশ নিয়ে মাত্র কয়েকজন স্বজনের উপস্থিতিতে দাফন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হলেও তা নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
শ্যামনগর থানার এসআই অনিরুদ্ধ বলেন, অনিরাপত্তার বিষয় নয়, আমরা দায়িত্ব পালন করার জন্য গাবুরাতে উপস্থিত ছিলাম। দাফন-কাফন কাজ সম্পন্ন করা পর্যন্তই আমরা প্রস্তুত ছিলাম। ভোররাতে ফিরে এসেছি শ্যামনগরে।
গত ২০ জুলাই রাতে ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে এমপি নজরুলের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে প্রথমে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করেন।
পরে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ফেইসবুকে পোস্টে ওই তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে ২২ জুলাই গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াতে ইসলামী। বিরোধী দল এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে পরে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়।
পিপলসনিউজ/আরইউ