কথাটা ক্যারিবিয়ান পেস কিংবদন্তি অ্যান্ডি রবার্টসের। মাইকেল হোল্ডিংকে নিয়ে বলেছিলেন। সত্তর-আশির দশকে ক্যারিবিয়ান বিখ্যাত পেস ‘চতুষ্টয়ে’র একজন হোল্ডিং। বোলিংয়ের সময় তার দৌড় এতটাই মসৃণ ও স্বচ্ছন্দ ছিল যে তিনি যে আসছেন, সেটা আম্পায়ারও টের পেতেন না। দুর্দান্ত এই রানআপ ও ভয়ংকর গতির কারণে ‘হুইসপারিং ডেথ’ নামটা চিরস্থায়ীভাবে লেগে গেছে হোল্ডিংয়ের গায়ে। এবার সেই ‘হুইসপারিং ডেথ’ই মুখ খুললেন ইমরান খানকে নিয়ে।
কিংবদন্তি এ পেসার এবং ক্রিকেটের অন্যতম সম্মানিত কণ্ঠস্বর পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। পাকিস্তানকে অধিনায়ক হিসেবে ১৯৯২ বিশ্বকাপ জেতানো ইমরান সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। হোল্ডিং তার সাবেক প্রতিপক্ষ এবং বন্ধুর সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, আরও গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সঙ্গেও এমন দুর্ব্যবহার করা হয় না।
ইমরান জেলে আছেন তিন বছরের বেশি সময়। গত দুই সপ্তাহে তার স্বাস্থ্য নিয়ে ক্রিকেট–বিশ্বে উদ্বেগ বেড়েছে। এর আগে ২২ জন আন্তর্জাতিক সাবেক অধিনায়কের একটি দল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে খোলা চিঠি লিখে ইমরানের মৌলিক মর্যাদা নিশ্চিতের আহ্বান জানান। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স, ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা, পাকিস্তান কিংবদন্তি জাভেদ মিয়াঁদাদ ও ওয়াসিম আকরাম ৭৩ বছর বয়সী ইমরানের সুচিকিৎসা, মৌলিক অধিকার ও মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন এর আগে।
১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের পর খেলা ছেড়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ইমরান খান এবং ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার পর দুর্নীতি ও অন্যান্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে রয়েছেন। এর আগে পাকিস্তানের আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন, মেডিক্যাল বোর্ডের মাধ্যমে ইমরানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের সঙ্গে সাপ্তাহিক সাক্ষাতের সুযোগ দিতে হবে। অভিযোগ, সেসব নির্দেশ ঠিকভাবে মানা হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এর আগে ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে তাকে রাখা হয় মাত্র কয়েক ঘণ্টা। পরীক্ষা করে রাষ্ট্র নিযুক্ত একটি দল, আদালত নির্ধারিত বোর্ড নয়। এরপর দ্রুত তাকে ‘মেডিক্যালি ফিট’ ঘোষণা করে ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে। পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই তখন প্রশ্ন তুলে চিঠি পাঠিয়েছিলেন ২২ জন আন্তর্জাতিক সাবেক অধিনায়ক।
ভারতের সংবাদমাধ্যম টাইমস নাউয়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় শুরুতে পাকিস্তান ক্রিকেটের বেহাল অবস্থা নিয়ে কথা বলেন হোল্ডিং। এরপর উঠে আসে ইমরানের প্রসঙ্গ। হোল্ডিং বলেন, ‘পাকিস্তানে আরও কিছু বিষয় আছে। আমি সেসবে জড়াতে চাই না, ব্যাপারটা রাজনৈতিক। শুধু একটি নাম উল্লেখ করব— ইমরান খান। হয়তো আপনি রাজনৈতিক পথে হাঁটতে চান না, আমিও চাই না, কিন্তু এটি অত্যন্ত দুঃখজনক গল্প।’
ইমরানকে হোল্ডিংয়ের সমর্থনের পেছনে শুধু দুই কিংবদন্তি ক্রিকেটারের বন্ধুত্বের সম্পর্কই নেই। ইমরানের বিপক্ষে খেলার পাশাপাশি তার সঙ্গে লন্ডনেও ঘুরেছেন জ্যামাইকান এই সাবেক পেসার। ইমরান তখন তার ক্যানসার হাসপাতাল গড়তে তহবিল সংগ্রহে নেমেছিলেন।
৭২ বছর বয়সী হোল্ডিং সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আমি ইমরানের সঙ্গে খেলেছি, তবে বলব না যে খুব বেশি খেলেছি। তার সঙ্গে কিছু ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছি। কাউন্টি ক্রিকেটেও ইমরানের বিপক্ষে কয়েকটি ম্যাচ খেলেছি। তবে ইমরানের সঙ্গে খেলাধুলা ছাড়াও আমি তার সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। ইমরান যখন ক্যানসার হাসপাতালের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে লন্ডনে ঘুরে বেড়িয়েছে, তখন তার সঙ্গে ঘুরেছিলাম। এ বিষয়ে আমি তাকে সাধ্যমতো সমর্থন করার চেষ্টা করেছি।’
হোল্ডিং এরপর বলেন, ‘তাই আমি মানুষটিকে ভালোভাবে জানি এবং তিনি ঠিক কী ধরনের মানুষ, তা আমার জানা আছে। বর্তমান পরিস্থিতি এবং ইমরান খানের সঙ্গে যা ঘটছে, তা দেখা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
ইমরানের যথাযথ চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সাবেক অধিনায়কেরা যে চিঠি পাঠিয়েছেন, তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন হোল্ডিং। বিষয়টি রাজনীতি দিয়ে নয়, বরং মানুষের মৌলিক মর্যাদার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন কিংবদন্তি।
হোল্ডিং জোরালোভাবে বলেন, ‘যে অধিনায়কেরা ওই চিঠি লিখেছেন, আমি তাদের পুরোপুরি সমর্থন করি। এর কী প্রভাব পড়বে আমি জানি না, তবে মানুষটিকে যেন সাধারণ মানুষের মতো চিকিৎসা দেওয়া হয়—সেই চেষ্টার প্রতি আমি পূর্ণ সমর্থন করি। কেউ মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করে না। খুনির সঙ্গেও এমন আচরণ করা হয় না। তাহলে এই মানুষটির সঙ্গে কেন এমন আচরণ করা হবে, তার কোনো কারণ আমি দেখি না।’ তাঁর এসব কথা প্রমাণ করে যে তার এই আহ্বান রাজনীতির চেয়ে মানবতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।
হোল্ডিং আরও বলেন, ‘এর পেছনে কোনো ঈর্ষা কাজ করছে কি না, আমি জানি না। কারণ, ইমরান খানের মতো...বিশ্বজুড়ে এত বেশি পরিচিত কোনো পাকিস্তানি নাগরিক আছেন বলে আমার মনে হয় না। ওই মানুষটির সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা হচ্ছে, তা এককথায় হাস্যকর।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৬০ টেস্টে ২৪৯ উইকেট নিয়েছেন হোল্ডিং। ১০২ ওয়ানডেতে তার শিকার ১৪২ উইকেট। খেলা ছাড়ার পর ধারাভাষ্যেও কিংবদন্তিতুল্য হয়ে উঠেছিলেন। ভারি ও পরিশীলিত কণ্ঠের জন্য অনেকের চোখেই তিনি মাইক্রোফোনের সামনে ক্রিকেটের মরগান ফ্রিম্যান। কিন্তু ২০২১ সালে ক্রিকেট ধারাভাষ্যকে বিদায় জানান হোল্ডিং।
পিপলসনিউজ/আরইউ