আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) দিয়ে বানানো ভিডিও এখন এতটাই বাস্তবসম্মত হয়ে গেছে যে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন। বিশেষ করে টিকটক, ইউটিউব শর্টস আর রিলসে এখন এমন অনেক নিখুঁত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে।
তাহলে কীভাবে বুঝবেন কোনো ভাইরাল ভিডিও এআই দিয়ে বানানো কিনা?
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ স্কুল অফ ম্যানেজমেন্টের এআই গবেষক নেগার কামালি প্রযুক্তি সাইট ম্যাশএবলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যদি আমি কোনো ত্রুটি নাও পাই, তবু নিশ্চিত করে বলতে পারি না এটি আসল। আর প্রযুক্তি এটাই চায়।
আগে বিকৃত মুখ, অদ্ভুত আঙুল বা অস্বাভাবিকরকম মসৃণ টেক্সচার দেখে সহজেই বোঝা যেত ভিডিওটা এআই দিয়ে তৈরি। তবে প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, এসব ত্রুটি ততই লুকিয়ে যাচ্ছে। সাময়িক অসঙ্গতিগুলো এখন অনেকটাই মুছে ফেলা যায়। তবে সামান্য কিছু সূক্ষ্ম জায়গায় সত্য ধরা পড়ে যায়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে বোঝা যাবে কোনো ভাইরাল ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি কিনা।
১. ভিডিওর প্রেক্ষাপট দেখুন: এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওগুলো সাধারণত অদ্ভুতভাবে নির্দিষ্ট সেটিংয়ে হয়। বেশিরভাগ রাতের দৃশ্যে, কালো বা অনিক্স ফিল্টারযুক্ত ‘নাইট ভিশন’ এফেক্টে। এর কারণ শুধু শিল্পিত রূপ বা ‘অ্যাস্থেটিক’ নয়। এই অন্ধকার ফিল্টার ছোটখাটো গ্লিচ বা ফ্রেমের অসঙ্গতি লুকিয়ে রাখে যা এআই ফুটেজে প্রায়ই দেখা যায়।
২. ডিভাইসের চিহ্ন খুঁজুন: ভিডিওতে যদি বলা হয় এটা ডোরবেল ক্যামেরা বা সিকিউরিটি ক্যামেরায় তোলা তাহলে ভালো করে দেখুন টাইমস্ট্যাম্প, ব্র্যান্ড লোগো বা ইন্টারফেইস ওভারলে আছে কিনা। এগুলো না থাকাটা সন্দেহজনক। তবে এগুলো থাকলেই ভিডিও আসল এমনটাও নয়। এসব এআই দিয়েও যোগ করা যায়।
৩. বাস্তবতার সঙ্গে মেলান: বাস্তব পৃথিবীতে চলাফেরার একটা নিয়ম আছে। যেমন প্রাণীরা কখনো টানা ১০ সেকেন্ড ধরে একই ছন্দে লাফায় না বা কোনো তিমি হঠাৎ একজন কর্মীকে টেনে জাহাজের ডেকে নেয় না। এসব ‘অসম্ভব’ মুভমেন্টই ইঙ্গিত দেয় ভিডিওটি সিনথেটিক।
৪. ভিডিওর দৈর্ঘ্য দেখুন: ছোট ভিডিওগুলোতে এআইয়ের ভুল লুকানো সহজ হয়। এজন্যই অনেক ভাইরাল এআই ভিডিও ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় যেন কিছু ভুল চোখে না পড়ে।
ইউসি বার্কলের অধ্যাপক হানি ফরিদ বলেছেন, ‘যদি ভিডিওটা ১০ সেকেন্ডের হয় তাহলে সন্দেহ করুন। ছোট রাখার একটা কারণ আছে।’
একইভাবে, যদি বড় ভিডিও অনেক ছোট ক্লিপ একত্রে জোড়া দিয়ে বানানো হয়, তাহলেও সতর্ক থাকুন। কারণ বেশিরভাগ এআই ভিডিও জেনারেটর এখনো আট থেকে ২০ সেকেন্ডের ছোট ভিডিওই তৈরি করতে পারে যেমন গুগল ভিও ৩ সর্বোচ্চ আট সেকেন্ডের ক্লিপ তৈরি করে আর ওপেনএআই-এর সোরা এক থেকে ২০ সেকেন্ডের মধ্যে ভিডিও বানায়।
৫. শব্দ খেয়াল করুন: এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওতে প্রায়ই অস্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার অডিও অথবা মেলানো যায় না এমন ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ বা পুরো নীরবতা থাকে।
এমআইটি’র কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাবের গবেষক অরুনা শংকরনারায়নন বলেছেন, ‘তারা কিছু বানিয়ে ফেলে বা কিছু বিকৃত করে, যা খণ্ডন করা কঠিন হয়ে যায়।’ তাই অতিরিক্ত পরিষ্কার বা সম্পূর্ণ নীরব অডিও অনেক সময় বড় ক্লু।
৬. লেখার ভুল খুঁজুন: এআই এখনো পড়ার মতো লেখা তৈরিতে দুর্বল। ভিডিওর কাপড়, সাইনবোর্ড, প্যাকেট ইত্যাদিতে চোখ রাখুন। বিকৃত অক্ষর, অর্থহীন চিহ্ন বা গুলিয়ে যাওয়া লেখাই বড় ইঙ্গিত।
৭. অসম্ভব মুভমেন্ট লক্ষ্য করুন: মানুষ বা প্রাণীর শরীরে সূক্ষ্ম ভর পরিবর্তন, অনিয়মিত চলাফেরা বা চোখের ক্ষুদ্র নড়াচড়া থাকে। এআই ভিডিওতে এগুলো থাকে না। কখনো দেখা যায়, একাধিক মানুষ বা বস্তু হঠাৎ একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে বা রং বদলে যাচ্ছে যা বাস্তবে সম্ভব নয়।
৮. ওয়াটারমার্ক খুঁজুন: অনেক এআই ভিডিও জেনারেটর যেমন সোরা বা ভিও ৩ নিজ থেকেই ওয়াটারমার্ক বা মেটাডেটা যুক্ত করে যাতে ভিডিও শনাক্ত করা যায়। এগুলো কখনো কোণে, কখনো স্বচ্ছ লেয়ার হিসেবে আবার কখনো ডিজিটাল সিগনেচার আকারে থাকে।
গুগল ডিপমাইন্ডের সিন্থআইডি’র মতো টুল এ দিক থেকে আশাব্যঞ্জক। যদিও অনেক সময় ভাইরাল ভিডিওতে এসব চিহ্ন কেটে বা ক্রপ করে ফেলা হয়।
৯. অ্যাকাউন্টের আগের হিস্ট্রি দেখুন: অনেক সময় একদল ‘এআই স্লপ ফার্মার’ একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ নকল ভিডিও বানিয়ে ফেলে। কোনো সন্দেহজনক ভিডিও দেখলে সেই অ্যাকাউন্টে যান। দেখবেন, তারা অল্প সময়েই ডজনখানেক এমন ভিডিও পোস্ট করেছে। সেটাই বড় ইঙ্গিত যে ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি।
বর্তমানে এআই ভিডিও প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে বাস্তবের সঙ্গে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু ছোটখাটো বিবরণ, অস্বাভাবিক ছন্দ বা অসম্ভব কোনো মুহূর্তের দিকে নজর রাখলেই হয়তো বুঝে ফেলা যাবে স্ক্রিনে দেখা ঘটনাটি সত্যি নয় বরং নিখুঁতভাবে সাজানো এক কৃত্রিম ছলনা।
পিপলসনিউজ/আরইউ