ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ঠাঁই দেওয়ার প্রতিবাদে সেই স্থানটিতে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি সাঁটিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বেলা ৩টার দিকে ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী ছবিটি সাঁটান।
এর আগে বেলা আড়াইটায় ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার।
জানতে চাইলে অর্ক বড়ুয়া বলেন, জুমা বলেছিল, তার ইচ্ছা করেছে, তাই জিন্নাহর ছবি লাগিয়েছে। ঠিক তেমনই আমাদের ইচ্ছা করেছে গোলাম আযমের ছবি লাগাতে, তাই লাগিয়েছি। তিনি বলেন, ডাকসু কারো বাপের না। ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন কেউ মেনে নেবে না। আর গোলাম আযমরা একাত্তরে যা করেছে, তার ফলাফল স্বরূপ একাশিতে মানুষ তাকে জুতাপেটা করেছে। আমরা এদেশের আপামর মানুষের সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করেছি।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি বায়তুল মোকারম মসজিদে এক জানাজায় গিয়ে জুতাপেটার শিকার হয়েছিলেন। ওই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের প্রতীক হয়ে আছে।
গোলাম আযম একাত্তরে শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যেসব আধা সামরিক বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা এদেশে ব্যাপক হত্যা ও নির্যাতন চালায়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও প্রকাশ্যে তদবির চালান এই জামায়াত নেতা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালে তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেই সাজা ভোগের মধ্যেই পরের বছর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সংস্কার শেষে রোববার সংগ্রহশালা চালু করে ডাকসু, যেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি ঠাঁই না পেলেও নতুন করে যুক্ত হয় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি।
এ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মধ্যে সোমবার দুপুরে সেই তিনটি ছিঁড়ে ফেলে প্রতিবাদ জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার।
তিনি বলেন, এদেশের ভাষা আন্দোলনের আসল নায়কদের বাদ দিয়ে পাকিস্তানের জাঁদরেল জিন্নাহর ছবি কেন ডাকসু রেখেছে তার জন্য প্রশাসন ও ডাকসুর নেতাদের জবাব দিতে হবে। যে জিন্নাহ আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, সে জিন্নাহকে কীভাবে এখানে রাখে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ সব জায়গায় রক্তগঙ্গা দিয়েছে। এখানে থাকতে হবে ভাষা আন্দোলনের নায়ক আবুল কাসেমের (ছবি)। এখানে থাকবে শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ।
আবু তৈয়ব হাবিলদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি ২০২৫ সালে ডাকসু নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে স্বতন্ত্রভাবে ভোট করেছিলেন।
ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘বিতর্কিত’ ছবি প্রদর্শনের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
সোমবার সকালে সংগঠনটি বলেছে, শিবির নিয়ন্ত্রিত ডাকসুর এই পরিষদ শিক্ষার্থীদের গণআকাঙ্ক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিকামী চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতি তাদের প্রচ্ছন্ন অনুরাগ ও ‘পাকিস্তান প্রেম’ জাহির করছে।
জিন্নাহর ছবি টাঙানোর ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে ঢাবি: ডাকসু সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সোমবার এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
পিপলসনিউজ/আরইউ