জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে তার প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন সবজির দাম নতুন করে বাড়ছে।
একই সঙ্গে বৃষ্টি ও সরবরাহ ঘাটতিও কিছু সবজির দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে বাজারের চিত্র সব পণ্যে এক নয়— সপ্তাহের ব্যবধানে পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই ও পাবদাসহ কয়েক ধরনের মাছ এবং ব্রয়লার মুরগির দাম কমেছে; গরুর মাংসের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত।
ফার্মের সাদা ডিম ও চালের দামও মোটামুটি আগের সপ্তাহের পর্যায়ে থাকলেও ব্রাউন ডিম এবং পাস্তুরিত তরল দুধের দাম বেড়েছে।
ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব মিলিয়ে রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই নিত্যপণ্যের দামে ওঠানামা চলছে। কখনো কোনো পণ্যের দাম কমছে, আবার কিছুদিনের মধ্যেই তা বেড়ে যাচ্ছে। নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। যার প্রভাবে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে।
তবে পরিবহনব্যয় যতটা বেড়েছে, খুচরা পর্যায়ে অনেক পণ্যের দাম তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ানো হচ্ছে— এমন অভিযোগ ক্রেতাদের।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে ১৯ এপ্রিল ও ১ জুনও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল।
ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানির দামবৃদ্ধির কারণে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে এর প্রভাব পড়ছে এবং সেই বাড়তি ব্যয় খুচরা বাজারেও যুক্ত হচ্ছে।
বাজারে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে বেড়েছে বেগুনের দাম বেড়েছে। লম্বা বেগুনের দাম বাজারভেদে ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এ ধরনের বেগুন ৯০-১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। করলার দাম কিছুদিন আগে কমে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় নেমেছিল। এখন মানভেদে তা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ছোট আকারের পটোল ও ঢ্যাঁড়শের দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা হয়েছে। এক সপ্তাহ আগেও এসব সবজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
এ ছাড়া ঝিঙা, ধুন্দলসহ বিভিন্ন সবজির দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে কাঁচা পেপে আগের মতো ৩০ টাকা কেজি এবং কাঁচামরিচ আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।
গত সপ্তাহে প্রতি কেজি পাঙাশ ২৩০ টাকা দরে বিক্রি হলেও আজ তা কমে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ এক সপ্তাহে কেজিতে দাম কমেছে ৩০ টাকা। তেলাপিয়ার দাম গত সপ্তাহের ২৬০ টাকা থেকে কমে আজ ১৮০ টাকা হয়েছে। ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে তেলাপিয়ার দাম কমেছে ৮০ টাকা।
মাঝারি আকারের রুই মাছও গত সপ্তাহের তুলনায় কম দামে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে মাঝারি রুইয়ের দাম ছিল ২৭০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি। আজ একই মাছ ২৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহের সর্বনিম্ন দামের তুলনায় কেজিতে ৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দামের তুলনায় ১১০ টাকা কমে পাওয়া যাচ্ছে।
পাবদার দামও গত সপ্তাহের ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা থেকে কমে আজ ৩০০ টাকা কেজিতে নেমেছে। আজকের বাজারে কই মাছ ২০০ টাকা এবং সিলভার মাছ ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মুরগির বাজারে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। গত সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও আজ তা কমে ১৭৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ কেজিতে দাম কমেছে ১৫ টাকা। হাইব্রিড সোনালি মুরগি আজ ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে এ মুরগির দাম ছিল ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি।
অন্যদিকে গরুর মাংসের দামে কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত সপ্তাহের মতো আজও প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে ডিমের বাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। গত সপ্তাহে ব্রয়লার সাদা ডিম ১৪০ টাকা ডজন এবং ব্রাউন ডিম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হয়েছিল। আজ ব্রয়লার সাদা ডিমের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে— ১৪০ টাকা ডজন। তবে ব্রাউন ডিমের দাম বেড়ে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা ডজন হয়েছে। অর্থাৎ ডজনপ্রতি ব্রাউন ডিমের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দামে পাঁচ টাকা করে বেড়েছে।
এ ছাড়া আজকের বাজারে প্রতি ডজন হাঁসের ডিম বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকা দরে।
বেড়েছে পাস্তুরিত তরল দুধের দাম। সম্প্রতি কয়েকটি বেসরকারি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রতি লিটার দুধের দাম ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর আগে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাও প্রতি লিটার দুধের দাম ১০ টাকা বাড়িয়েছিল। এরপর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও দাম বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে আটা ও ময়দার দামও আগের তুলনায় বেশি। দুই সপ্তাহ আগে সরবরাহকারী করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আটা-ময়দার দাম বাড়িয়েছে।
মিরপুর-১ নম্বর কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, পরিবহন খরচ বেড়েছে। আর তাই পাইকারি বাজারে সবজির দাম বেড়েছে।
একই বাজারে মিজান নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, যশোর থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বেগুন আসে। প্রায় ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে পাইকাররা কিনে আনতেন। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে মাঝারি আকারের একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা। তেলের দাম বাড়ায় ট্রাকভাড়া বেড়ে ২১ হাজার টাকা হয়েছে। এখন কারওয়ান বাজারেই ১০০ টাকায় ওপরে বেগুন বিক্রি হচ্ছে।
মিরপুর-১১ নম্বর কাঁচাবাজারে কথা হয় চাকরিজীবী মিনহাজের সঙ্গে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, সেটার প্রভাব পণ্যের এক-দুই টাকা বাড়তে পারে। একবারেই যে ১০-২০ টাকা পড়বে, এমনটা হওয়ার কথা নয়। একেবারেই নজরদারি নেই বাজারে। এই সুযোগে যে যার মতো দাম বাড়াচ্ছে।
মালিবাগ বাজারে বাজার করতে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, আজকে বাজারে সবজির দাম কিছুটা বাড়তি দেখা যাচ্ছে। দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিক্রেতারা বলছে পরিবহন খরচ বেড়েছে, পাশাপাশি বৃষ্টির কারণে বাজারের সবজির সরবরাহ কম।
সবজির দাম বিষয়ে রামপুরা বাজারের সবজি বিক্রেতা রহিদুল ইসলাম বলেন, দুই-তিন রকমের সবজির দাম কিছুটা বাড়তি তবে বাকি সব সবজি মোটামুটি ৮০ টাকার ঘরে রয়েছে। মূলত কয়েকদিন বৃষ্টি হচ্ছে সে কারণে ফসলের ক্ষেতে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে কারণে বাজারে সরবরাহ কিছুটা কম।
রামপুরা বাজারে কথা হয় ক্রেতা জাহিদ হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, কম-বেশি মাছ প্রতি সপ্তাহেই কেনা হয়। আজকে মাছের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় কম দেখছি। তবে মাছের আকার কিছুটা ছোট মনে হয়েছে। কিন্তু, ডিমের দাম যেভাবে বাড়ছে, এটা তো আর সাধারণ মানুষ কিছুদিন পর কিনতে পারবে না।
একই বাজারে মাছ বিক্রেতা রুবেল বলেন, মাছের দাম প্রতিদিন একই থাকে না। বাজারে মাছের সরবরাহ বেশি থাকলে দাম কিছুটা কমে, আবার সরবরাহ কম হলে দাম বেড়ে যায়।
মগবাজারে মুরগি বিক্রেতা শরিফ বলেন, গত সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা কেজি ছিল, এখন ১৭৫ টাকায় বিক্রি করছি। হাইব্রিড সোনালিও আগের দামেই আছে। শুক্রবারে চাহিদা থাকে বেশি। আমরা কমে পেয়েছি বলেই কমে বিক্রি করতে পারছি।
সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাজার নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নজরদারি ও মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে পণ্যের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হবে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, তদারকি চলমান থাকলেও বাজারে পণ্যের দাম কমছে না। কারণ একাধিক সংস্থা নানাভাবে বাজার তদারকি করলেও তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। তাই বিভিন্ন অজুহাত কাজে লাগিয়ে অসাধু চক্র কারসাজির ছক তৈরি করছে। সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে পকেট কাটা যাচ্ছে ভোক্তার।
তিনি বলেন, শক্তভাবে বাজারের লাগাম টানতে তেমন কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। কারণ দেখা গেছে ঢাকায় বাস করা দুই কোটি মানুষের জন্য ভোক্তা অধিদপ্তরের মাত্র ছয়টি টিম কাজ করছে। এই অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা দিয়ে ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করা কখনোই সম্ভব নয়। তাই ভোক্তাকে স্বস্তিতে রাখতে সরকারকে ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস)’ সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরী বলেন, এমনিতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিধ্বস্ত; অনেকের আয় নেই। বেকারত্ব বাড়ছে। আবার আয় বাড়ছে না বেশির ভাগ মানুষের। এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লেগেছে। বাজারে যেহারে দাম বাড়ার কথা তার চেয়েও বেশি দামে ক্রেতার পণ্য কিনতে হচ্ছে। সরকারের একাধিক সংস্থা বাজার তদারকি করলেও তাদের কাছে কোনো গবেষণাও নেই। তাই ভোক্তারা সরকারের বাজার মনিটরিংয়ে কোনো সুফল পাচ্ছেন না।
বৃহস্পতিবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চার দিনে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সারা দেশে ১৬৩টি টিম, ৩১১টি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম পাওয়ায় ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা করে।
অধিদপ্তর সূত্র আরও জানায়, অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সরাসরি রাজধানীসহ সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে রাজধানীতে অধিদপ্তরের ছয়টি টিম কাজ করছে। পাশাপাশি অধিদপ্তরের টিমের সঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা যুক্ত থেকে তদারকি করছেন।
পিপলসনিউজ/আরইউ