জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী ও মেগা প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর বরখাস্ত করা হলেও, মাত্র ১২ দিনের মাথায় তাঁকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দিয়ে স্বপদে পুনর্বহাল করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
একই সচিবের স্বাক্ষরে মাত্র সাত কর্মদিবসের ব্যবধানে জারি করা দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী প্রজ্ঞাপন নিয়ে প্রশাসনিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও প্রশ্ন উঠছে। নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়—মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির ‘প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত’ হয়েছে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাঁকে ডিপিএইচই সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তবে সেই আদেশের মাত্র ১২ দিন পর, ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একই সচিবের স্বাক্ষরে আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
তথ্য বলছে, দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে আগের অবস্থান সম্পূর্ণ বদলে দাবি করা হয় যে, তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’। ফলে তাঁকে সব দায় থেকে অব্যাহতি দিয়ে মেগা প্রকল্পের পরিচালক পদে পুনর্বহাল করা হয় এবং বরখাস্তকালীন সময়কে নিয়মিত কর্মকাল হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারি চাকরি সংক্রান্ত আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ন্যূনতম ১০ কার্যদিবস সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক। এরপর তদন্ত বোর্ড গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ গ্রহণের মতো ধারাবাহিক ধাপ রয়েছে। তথ্য বলছে, তবিবুর রহমানের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া কীভাবে মাত্র সাত কর্মদিবসে শেষ হলো, কিংবা আদৌ কোনো তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ বা শুনানি হয়েছিল কি না—তার কোনো দালিলিক ব্যাখ্যা দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে দেওয়া হয়নি।
ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ৯ এপ্রিল বরখাস্তের আদেশ জারির মাত্র তিন দিনের মাথায়, ১২ এপ্রিল তবিবুর রহমান প্রশাসনিক স্তরবিন্যাস ভেঙে সরাসরি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের কাছে পুনর্বহালের আবেদন জমা দেন। অভিযোগ উঠছে, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে এ আবেদন করা হলেও প্রতিমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে নথিতে সচিবের উদ্দেশে ‘জরুরিভিত্তিতে আলোচনা করুন’ মর্মে অনুশাসন প্রদান করেন।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত মোড় নেয় ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে, যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারি সফরে চীন গমন করেন। অভিযোগ রয়েছে, পূর্ণ মন্ত্রীর অনুপস্থিতির সুযোগে প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে সচিবের ওপর প্রশাসনিক চাপ বাড়ানো হয় এবং মন্ত্রী দেশে ফেরার আগেই ২২ এপ্রিল তড়িঘড়ি করে অব্যাহতিপত্র জারি করা হয়।
একাধিক অনুসন্ধানী সূত্র জানায়, এই দ্রুতগতির দায়মুক্তির নেপথ্যে প্রভাবশালী মহলে প্রায় ১০ কোটি টাকার গোপন তহবিল স্থানান্তর হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের সুবিধাভোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিকের পক্ষ থেকে শীর্ষ প্রশাসনিক স্তরে একটি বিলাসবহুল ‘হোন্ডা সিআর-ভি’ গাড়ি উপহার দেওয়ার তথ্যও আলোচনায় এসেছে।
তথ্য বলছে, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান একক কর্তৃত্বে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ৩,৮৭১ কোটি টাকা বরাদ্দের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ উত্তোলন করা হয়। একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে এই দুই প্রকল্প থেকেই প্রায় ৩৩১ কোটি টাকা সরাসরি আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়। তথ্য রয়েছে, এই পুনর্বহালের কয়েক দিন আগে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি প্রকল্প দুটির দুর্নীতি তদন্তে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছিলেন; তবে তবিবুর রহমানের অব্যাহতির পর সেই প্রক্রিয়াও কার্যত থমকে গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই প্রকৌশলী ২০২০ সালে ঢাকায় বদলি হওয়ার পর মেগা প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেন। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মীর আবদুস সহিদের অবসরের সময় ২৪ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে পদ দখলের চেষ্টা চালান তিনি। সূত্র জানায়, প্রথম প্রকল্পের পিডি পদ পেতে তবিবুর রহমান প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় করেছিলেন এবং পরবর্তী পদোন্নতির জন্য আরও ১৫ কোটি টাকার লেনদেন প্রক্রিয়াভুক্ত রেখেছিলেন বলে প্রচার রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তবিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার সদর হাসপাতাল রোডে সুরম্য ছয়তলা আবাসিক ভবন, শহরের ওপেল গার্ডেন এলাকায় একাধিক প্লট এবং জেলায় ১০ একরের বেশি কৃষিজমি। এছাড়া রাজধানীর ধানমন্ডি ৪/এ সড়কের ৩৯ নম্বর ভবনে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট (এ-২), মোহাম্মদপুর ইকবাল রোড ও গুলশানে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেসের তথ্য রয়েছে। তাঁর ব্যবহারের তালিকায় ঢাকা মেট্রো-ঘ ১২-৭৩৬৭ নম্বরের একটি বিলাসবহুল গাড়িসহ একাধিক দামি যানের সন্ধান মিলেছে।
দুদক তবিবুর রহমানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেও তা কার্যকর অগ্রগতি পায়নি বলে জানা যায়। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তবিবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন এবং প্রমাণ উপস্থাপনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। অন্যদিকে, মাত্র ১২ দিনের এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কোনো আইনি তদন্ত ছাড়া এত দ্রুত অভিযোগ ‘অপ্রমাণিত’ ঘোষণার ঘটনা সিভিল সার্ভিসের স্বচ্ছতার ওপর বড় আঘাত। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিরসনে তিনটি প্রধান পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি: প্রথমত- ৯ থেকে ২২ এপ্রিলের মধ্যকার নথি ও সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে একটি স্বাধীন প্রশাসনিক অডিট কমিটি গঠন। দ্বিতীয়ত-৩৩১ কোটি টাকা লোপাট এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বাধীনভাবে তদন্ত চালানোর সুযোগ দেওয়া ও সম্পদ ক্রোকের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া। এবং তৃতীয়ত- তদন্ত চলাকালীন স্বার্থের সংঘাত এড়াতে তবিবুর রহমানকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অবিলম্বে সরিয়ে অধিদপ্তরীয় সদর দপ্তরে সংযুক্ত রাখা। যদি এই অভিযোগের সত্যতা থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—এত বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে কীভাবে মাত্র ১২ দিনের মধ্যে দায়মুক্তি দিয়ে আবারও একই ধরনের আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন পদে ফিরিয়ে দেওয়া হলো?
পিপলসনিউজ/এস.সি