একটি মেয়ের বয়স যখন বই হাতে স্বপ্ন দেখার, তখন তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে সংসারের দায়িত্ব। যে বয়সে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা, সে বয়সেই অনেক কিশোরীকে দাঁড়াতে হচ্ছে বিয়ের আসরে। কারও বিয়ে হচ্ছে দারিদ্র্যের অজুহাতে, কারও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে, আবার কারও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে পরিবারের তথাকথিত সম্মান রক্ষার নামে। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়ার এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা কোথায়?
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন, প্রশাসনিক নির্দেশনা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি রয়েছে। তারপরও বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। এই পরিসংখ্যান নারীশিক্ষা, শিশু অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ হওয়ার দাবিটি তুলনাযোগ্য আঞ্চলিক উপাত্ত দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
আইন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে? বিয়ের আগে বয়স যাচাইয়ের দায়িত্ব কার? জন্মনিবন্ধনের তথ্য ভুল হলে দায় নেবে কে? অভিযোগ উঠছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত বয়স আড়াল করতে জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তন, বয়স বাড়িয়ে নতুন সনদ সংগ্রহ কিংবা একাধিক নথির অসংগতি কাজে লাগানো হচ্ছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে জন্মনিবন্ধনের মূল তথ্য, সংশোধনের আবেদন, অনুমোদনকারী কর্মকর্তা এবং বিয়ের নথি যাচাই জরুরি।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ১২ ধারায় জন্মনিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত সনদ ও পাসপোর্টকে বয়স প্রমাণের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অথচ নথিতে অসংগতি থাকলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একইভাবে তথাকথিত 'কোর্ট ম্যারেজের' নামে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে হলফনামা করাকে অনেক ক্ষেত্রে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু শুধু নোটারির সামনে হলফনামা সম্পাদন করলেই আইনগতভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয় না। এর আড়ালে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে হচ্ছে কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে।
আইনের ৭, ৮, ৯ ও ১১ ধারায় বাল্যবিবাহে অংশগ্রহণকারী প্রাপ্তবয়স্ক, অভিভাবক, বিয়ে সম্পাদনকারী ও নিবন্ধকের শাস্তির বিধান রয়েছে। নিবন্ধকের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং লাইসেন্স বা নিয়োগ বাতিলের ব্যবস্থাও রয়েছে। অন্যদিকে ১৯ ধারায় আদালতের নির্দেশ, অভিভাবকের সম্মতি ও বিধি অনুসরণ করে বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে বিয়ের ব্যতিক্রমী সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিধানের প্রয়োগে শিশুর স্বার্থ কতটা যাচাই হচ্ছে এবং কতটি আবেদন অনুমোদিত হয়েছে? এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বাল্যবিবাহের পেছনে দারিদ্র্যের পাশাপাশি নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বাস্তুচ্যুতি ও কর্মসংস্থানের সংকটও ভূমিকা রাখছে। বসতভিটা হারানো কিংবা মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় বহনে অক্ষম পরিবার কখনো বিয়েকে অর্থনৈতিক সমাধান মনে করছে। কিন্তু এতে দারিদ্র্যের চক্র ভাঙে না; বরং মেয়েটির শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ সংকুচিত হয়। MICS ২০২৫ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫৬ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে। এই হার ২০–২৪ বছর বয়সীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই, কারণ জনগোষ্ঠীর বয়সসীমা আলাদা। UNICEF-এর বিশ্লেষণেও দরিদ্র, গ্রামীণ ও শিক্ষাবঞ্চিত মেয়েদের বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাও এই সংকটকে জটিল করছে। ইভটিজিং, যৌন হয়রানি ও অনলাইন হয়রানির ভয়ে অনেক অভিভাবক মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ভুক্তভোগী কিশোরীর শৈশব কেড়ে নেওয়া কি ন্যায়বিচার? বাল্যবিবাহের ফলে শিক্ষা বন্ধ, কৈশোরে গর্ভধারণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, মাতৃ ও নবজাতকের জটিলতা এবং পারিবারিক সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ে। বয়স ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অসমতা অনেক মেয়েকে নির্যাতনের ঝুঁকিতেও ফেলে। UNICEF-এর হিসাবে, বাল্যবিবাহের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর আনুমানিক ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের সম্ভাবনা হারায়। অর্থাৎ ক্ষতি শুধু একটি পরিবারের নয়, জাতীয় অর্থনীতিরও।
আইনের ৯ ধারায় বাল্যবিবাহ সম্পাদন বা পরিচালনার জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ১১ ধারায় নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ইউনিয়ন পরিষদ, জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ ও বিবাহ নিবন্ধকদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয় প্রতিরোধ কমিটিগুলোর কতটি নিয়মিত সভা করে, কতটি বিয়ে বন্ধ করে, কতটি ঘটনায় মামলা হয় এবং কতজন নিবন্ধকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য কোথায়? শিশু অধিকার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য ও সামাজিক সুরক্ষার সম্মিলিত সংকট। UNICEF ও UNFPA-ও সমন্বিত প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রতিরোধে জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত সনদের তথ্য ডিজিটালভাবে যাচাই, জালিয়াতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা এবং বিয়ের আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করতে হবে। মেয়েদের উপবৃত্তি, নিরাপদ বিদ্যালয়, যাতায়াত ও দরিদ্র পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যবিবাহ বন্ধের পরও সংশ্লিষ্ট কিশোরীর শিক্ষা, নিরাপত্তা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব প্রশাসনকে নিতে হবে। প্রয়োজনে ১০৯ নম্বরে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, ১০৯৮ নম্বরে শিশু সহায়তা এবং ৩৩৩ নম্বরে সরকারি তথ্য ও অভিযোগের জন্য যোগাযোগ করা যায়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, একটি মেয়ের বিয়ে বন্ধ করার পর রাষ্ট্র কি তার ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেয়? জন্মনিবন্ধনে জালিয়াতির অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে কি? আইন লঙ্ঘনকারী অভিভাবক ও নিবন্ধকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি? স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতার জবাবদিহি কোথায়?
আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ কোথায়? কমিটি আছে, কিন্তু জবাবদিহি কোথায়? একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কোনো পরিবারের অর্থনৈতিক বোঝা কিংবা সামাজিক সম্মান রক্ষার হাতিয়ার হতে পারে না। বাল্যবিবাহ বন্ধের দায় শুধু অভিভাবকের নয়—রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজেরও।
পিপলসনিউজ/এস.সি