একটি ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সেই ফলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন- বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারছে, নাকি পরীক্ষার দিনই উন্মোচিত হচ্ছে বছরের পর বছর জমে থাকা ব্যর্থতা? ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন।
গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ৬৯ হাজার ৯৭ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে- কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন, প্রায় ৪২ শতাংশ। গত ২২ বছরের মধ্যে এত কম পাসের হার আর দেখা যায়নি। সংখ্যাগুলো কেবল পরীক্ষার ফল নয়; এগুলো দেশের শ্রেণিকক্ষ, পাঠদান, মূল্যায়ন ও শিক্ষা প্রশাসনের সামনে এক কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ।
ফলাফলের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি-এই দুই বিষয়ে। শুধু এ দুটি বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন, আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। অর্থাৎ প্রায় ছয় লাখ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশের ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দুই বিষয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী একই বিষয়ে পিছিয়ে পড়লেন কেন? এটি কি কেবল শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি, নাকি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট, দুর্বল পাঠদান এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন?
যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মতিন জানিয়েছেন, বোর্ডে ইংরেজি, আইসিটি ও উচ্চতর গণিতে অকৃতকার্যতার হার বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ইংরেজি পড়ানো হয়; আইসিটির বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকও পর্যাপ্ত নেই। নকলমুক্ত ও সুষ্ঠু পরিবেশে পরীক্ষা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এই বক্তব্যের মধ্যেই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ধরা পড়ে। যে বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক নেই, যে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত নয়, সেখানে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পরীক্ষার হলে সমান দক্ষতার প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত?
বোর্ডভিত্তিক ফলাফলেও বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ-সাধারণ বোর্ডগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে বরিশাল বোর্ডে তা নেমে এসেছে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে। রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ০৬, যশোরে ৪৪ দশমিক ৯২, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ এবং কুমিল্লায় ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। চট্টগ্রামে পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। বরিশাল বোর্ডের ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। দেশজুড়ে এমন শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯৩টি; গত বছর ছিল ২০২টি। বিপরীতে শতভাগ পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান।
এখানে প্রশ্নটি আরও গভীর। একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে দায় কি শুধু পরীক্ষার্থীদের? নাকি প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান, শিক্ষক উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা ও তদারকিরও জবাবদিহি থাকা উচিত? শূন্য পাসের তালিকায় থাকা কলেজগুলোর কতটিতে নিয়মিত ক্লাস হয়েছে, কতটিতে ইংরেজি ও আইসিটির পর্যাপ্ত শিক্ষক ছিলেন, কতটিতে ব্যবহারিক পাঠের ব্যবস্থা কার্যকর ছিল-এসব তথ্য প্রকাশ না করে কেবল ফলাফলের তালিকা প্রকাশ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
মানবিক বিভাগের ফলাফল বিশেষ উদ্বেগের। সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডে এ বিভাগে পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫০ দশমিক ৭৭ এবং বিজ্ঞান বিভাগে ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ মফস্বল ও গ্রামীণ কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, ইংরেজি শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ, আইসিটি ল্যাব ও পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি থাকলে তার প্রভাব পরীক্ষার খাতায় পড়াই স্বাভাবিক। তবে এই ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পরিণত করার আগে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষকসংখ্যা, ক্লাস নেওয়ার রেকর্ড, ল্যাব ব্যবহারের তথ্য এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির পরিসংখ্যান যাচাই করা জরুরি।
এবারের পরীক্ষায় পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি থেকে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে ফিরে আসার ধাক্কা অনেক শিক্ষার্থীর প্রস্তুতিতে চাপ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং একাডেমিক কার্যক্রমে বিঘ্ন যুক্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব কারণের কোনটি কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নির্ধারণের জন্য বোর্ডভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। অনুমানকে কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে প্রকৃত ব্যর্থতার জায়গাটি আড়ালেই থেকে যাবে।
খাতা মূল্যায়নের প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কেউ বলছেন, এবার খাতায় যা লেখা হয়েছে, সে অনুযায়ী নম্বর দেওয়া হয়েছে; বাড়তি নম্বরের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কারণেই ফল কমেছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীনও বলেছেন, শিক্ষার্থীরা খাতায় যেমন লিখেছে, সেভাবেই নম্বর পেয়েছে। বরিশাল বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজার বক্তব্য, যথাযথ পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মূল্যায়ন কঠোর হলেই কি তা নির্ভুল হয়? পরীক্ষক যদি ভুল করেন, নম্বর যোগে অসংগতি থাকে কিংবা একই উত্তরের মূল্যায়নে বোর্ডভেদে পার্থক্য তৈরি হয়, তাহলে সেই ত্রুটি শনাক্তের ব্যবস্থা কোথায়?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। ফল প্রকাশের পর তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে বড় কোনো ত্রুটি বা অসংগতি হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নন বলে জানিয়েছেন। পুনর্নিরীক্ষণের পর বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে বলে তাঁর বক্তব্য। একই সঙ্গে খাতা মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ সরকার নিজেও এখনই মূল্যায়নব্যবস্থাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখছে না। এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক, প্রধান পরীক্ষক ও বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাওয়াই স্বাভাবিক : মূল্যায়নের মান নিয়ন্ত্রণে কী ব্যবস্থা ছিল, কতটি খাতা দৈবচয়নভিত্তিতে যাচাই করা হয়েছে, পরীক্ষকদের মধ্যে নম্বর প্রদানের অস্বাভাবিক পার্থক্য পাওয়া গেছে কি না?
এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন পরীক্ষার্থী। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁদের এক মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন নেওয়া হবে ১ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত। এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের সময় বাঁচাতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু পুনঃপরীক্ষা কিংবা পুনর্নিরীক্ষণ কোনোভাবেই মূল সমস্যার বিকল্প সমাধান নয়। ভুল মূল্যায়ন হয়ে থাকলে তা সংশোধন করতে হবে; আর শিখন ঘাটতি থাকলে সেটি পূরণের জন্য কার্যকর সহায়তা দিতে হবে।
এখানেই প্রয়োজন ডাবল-বাইন্ড প্রশ্নের-যার উত্তর এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি বলে মূল্যায়ন যথাযথ হয়েছে, তাহলে প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী কেন অকৃতকার্য হলেন, তার বিষয়ভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করতে হবে। আর যদি মূল্যায়নে ত্রুটির আশঙ্কা থাকে, তাহলে পুনর্নিরীক্ষণের আগেই পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বোর্ডগুলো যদি বলে শিক্ষার্থীরা যথাযথ প্রস্তুতি নেয়নি, তাহলে শিক্ষকসংকট, ক্লাসের ধারাবাহিকতা ও ল্যাব সুবিধার তথ্য প্রকাশ করতে হবে। আর যদি প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতির প্রমাণ কোথায়?
শিক্ষাবিদদের বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্ট-পাসের হার বাড়ানোই শিক্ষার মানোন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। আবার পাসের হার কমলেই শিক্ষার মান বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। প্রকৃত মান যাচাই করতে হলে শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে, শিক্ষকরা কীভাবে পড়িয়েছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো কী সুযোগ দিয়েছে এবং মূল্যায়ন কতটা নির্ভুল ছিল-সবকিছু একসঙ্গে দেখতে হবে। এ জন্য ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, ব্যবহারিক পাঠের সুযোগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষ একাডেমিক অডিট জরুরি।
ফলাফলের পরিসংখ্যান প্রকাশ হয়েছে। এখন প্রয়োজন ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ হিসাব। কোন বোর্ডে কোন বিষয়ে কতজন ফেল করেছেন, কোন কলেজে শিক্ষকসংকট কতটা, কতটি ক্লাস হয়নি, কতটি প্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব অকার্যকর-এসব তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দায় নির্ধারণ করতে হবে শিক্ষা প্রশাসন, বোর্ড, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কারণ, শিক্ষার্থীর হাতে খাতা থাকে; কিন্তু শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়নব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ থাকে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের হাতে।
প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থীর ব্যর্থতাকে কি কেবল তাদের ব্যক্তিগত অযোগ্যতা বলে দায় সেরে ফেলা হবে? নাকি এই ফলাফলকে শিক্ষা ব্যবস্থার আয়নায় নিজেদের ব্যর্থতা দেখার সুযোগ হিসেবে নেবে সরকার? প্রশ্নটি এখন শুধু পাস-ফেলের নয়- একাধিক মহলের প্রশ্ন, আগামী প্রজন্মকে শেখানোর দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে?
পিপলসনিউজ/এস.সি