ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে ঢাকা, গাজীপুর ও আশুলিয়ার ৫২৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এসব কারখানা থেকে কাজ না করে বেরিয়ে এসেছেন কয়েক লাখ শ্রমিক।
রোববার (১ নভেম্বর) বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজিএমইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে মোট কারখানার সংখ্যা দুই হাজার ১৩৪টি। এর মধ্যে বর্তমানে এক হাজার ৮১৬টি কারখানা চালু থাকলেও শ্রম অসন্তোষের কারণে বন্ধ রয়েছে ৩১৮টি কারখানা।
সংগঠনটির এলাকাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডিএমপি এলাকায় মোট ৩২০টি কারখানার মধ্যে মিরপুরে ৬৮টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। কাজ না করে এসব কারখানা থেকে বেরিয়ে এসেছেন ৫১ হাজার ৬২৫ জন শ্রমিক।
গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকার ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে বন্ধ রয়েছে ২২৫টি। এ দুই এলাকায় কারখানা থেকে কাজ না করে বেরিয়ে এসেছেন পাঁচ লাখ ২৫ হাজার ৩৬০ জন শ্রমিক।
অন্যদিকে সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী এলাকার ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২৫টি বন্ধ রয়েছে এবং সেখানে কাজ না করে কারখানা থেকে বেরিয়ে এসেছেন এক লাখ ২৫ হাজার ২৭০ জন শ্রমিক।
এর আগে রোববার সকাল থেকেই পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সকাল থেকে গাজীপুর, ঢাকার মিরপুর এবং আশুলিয়ার প্রধান প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা।
আন্দোলনরত আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে পরিবার নিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া কারখানায় চাকরির ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের প্রাধান্য দেওয়ায় পুরুষ শ্রমিকেরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলেও তারা দাবি করেন। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে তারা ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে যৌথ বাহিনী মাঠে নেমেছে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সকাল থেকে কর্মবিরতি পালন করেছেন। তাদের আন্দোলনের মুখে সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে পুলিশ।
এ ছাড়া গাজীপুর শিল্প পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের মুখে গাজীপুরে ১০০ কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সোমবার কারখানাগুলো চালু হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনাবাড়ি থেকে শুরু করে কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ পর্যন্ত সড়কের পাশে থাকা কারখানাগুলোতে শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। এতে এসব কারখানা কর্তৃপক্ষ বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। আমরা এসব স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রেখেছি।
জানা যায়, রোববার সকাল থেকেই আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম পোশাক কারখানা ও টাউজার লাইন এবং নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। পরে তারা কারখানা থেকে বের হয়ে সড়কে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে ওই তাদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অন্যান্য পোশাক কারখানার শ্রমিকরাও আন্দোলনে যোগ দেন। দুপুর ১২টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেন। এ সময় আন্দোলনরত শ্রমিকদের থামানোর চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এদিন বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাস স্ট্যান্ডের শ্রমিকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ ও অবরোধ করেন পোশাক শ্রমিকরা। পরে বিকাল ৫টার দিকে পুলিশ পোশাক শ্রমিকদের সড়ক থেকে সড়িয়ে দেন।
এ ছাড়া গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি, মৌচাক, কোনাবাড়ীসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কয়েকটি পয়েন্টেও রোববার সকাল থেকে শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কে কাঠ ও বাঁশ ফেলে আগুন দেন তারা। ভাঙচুর করা হয়, যানবাহন, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আগুন দেওয়া হয় পুলিশ বক্স ও একটি গাড়িতে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে একে একে প্রায় ১০০ কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
আন্দোলনরত শ্রমিকরা জানান, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তকরণ বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। এ সময় কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করে চাকরি থেকে ছাঁটাই ও বিভিন্ন অজুহাতে কারখানা কর্তৃপক্ষের নিজেদের ইচ্ছামতো শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধের দাবি জানান।
সাভার-আশুলিয়ায় কমফোর্ট কালেকশন নামে একটি পোশাক কারখানার অপারেটর রাজু আহমেদ বলেন, আমাদের এই পোশাক কারখানায় হেলপারদের বেতন আট হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা মাত্র। অন্যান্য পোশাক কারখানায় তাদের বেতন অনেক বেশি। অন্যান্য পোশাক কারখানায় হাজিরা বোনাস এক হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হলেও আমাদের কারখানাতে দেওয়া হয় মাত্র ৫০০ টাকা। আমরা ন্যূনতম ন্যায্যমজুরি ও ভাতার দাবিতে রাস্তায় নেমেছি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শ্রমিকরা তিনটি প্রধান দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। তার মধ্যে প্রধান দাবি ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। তবে এ নিয়ে মজুরি বোর্ড আজকে গঠন হয়েছে।
এদিকে ডিসেম্বরকে সামনে রেখে একটি মহল দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ করেছেন শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। রোববার রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের সামনে আসেন।
তিনি বলেন, আজকের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আপনারা জানেন একটি মহল ডিসেম্বরকে সামনে রেখে চক্রান্ত করছে। সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের লিপ্ত। আমাদের আলোচনা হয়েছে, জনগণের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং যারা এইসব মানে আপনাকে এটা ক্লিয়ার যে সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য ডিসেম্বরকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলে এইসব যারা শ্রমিকের সঙ্গে না তারা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আপনারা জানেন ফ্যাসিবাদের সেই আবার বিভিন্ন ষড়যন্ত্র চক্রান্ত লিপ্ত। ইনশাআল্লাহ আমরা রাজনৈতিকভাবে সেটা মোকাবেলা করব।
শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আরও জানান, শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কারখানা চালু রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জননিরাপত্তা ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের।
পিপলসনিউজ/আরইউ