ভারত ও বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক এবং সহযোগিতা আগের মতোই আছে উল্লেখ করে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেছেন, দুই দেশের পারস্পরিক সার্বিক সম্পর্ক তখনই স্বাভাবিক হবে, যখন বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে। তবে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক একদম ঠিক আছে, সব মসৃণভাবে চলছে।
সেনা দিবস পালনের আগে সোমবার (১৩ জানুয়ারি) সেনাবাহিনীর বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও সামরিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ভারতের সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের যে স্থলসীমান্ত, তার ছোট একটি অংশ অন্য দেশের (মিয়ানমার) সঙ্গে, এ তথ্য উল্লেখ করে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, ‘বাকি পুরোটাই ভারত। কাজেই আমরা প্রতিবেশী। আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে। পরস্পরকে বুঝতে হবে। কোনো ধরনের বৈরিতায় কারো স্বার্থ রক্ষা হবে না।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার (কৌশলগত অংশীদার)। কোনো ধরনের শত্রুতা দুই দেশের জন্যই ক্ষতিকর।
গত জুনে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই জেনারেল দ্বিবেদীর প্রথম সংবাদ সম্মেলন।
ভারতের সেনাপ্রধান আরো বলেন, ‘আমরা প্রতিবেশী। আমাদের দুই দেশকেই একসঙ্গে বাস করতে হবে। পরস্পরকে জানতে ও বুঝতে হবে। কোনো ধরনের শত্রুতা কারো পক্ষে ভালো নয়।’ তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক একেবারে ঠিক রয়েছে। কিন্তু দুই দেশের সার্বিক সম্পর্কের কথা যদি বলেন তাহলে বলব, নির্বাচিত সরকার এলেই তা স্বাভাবিক হবে।’
সীমান্তে চলমান উত্তেজনার উল্লেখ করে ভারতীয় এক সাংবাদিক জানতে চান, সীমান্ত রক্ষার জন্য দেশটির সেনাবাহিনী কতটা প্রস্তুত? সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই অন্য দেশের হাইকমিশনারকে তলব করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, এমন সময় প্রশ্নটি তোলা হয়। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে ডাকা হয় রবিবার। ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই দিল্লিতে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মো. নূরাল ইসলামকে ডেকে পাঠায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তখন বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেন, সে দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। গত আগস্টে রাজনৈতিক পালাবদলের সময় সর্বদা তারা যোগাযোগের মধ্যে ছিলেন। এমনকি গত ২৪ নভেম্বরও তাদের দুজনের মধ্যে ভিডিও মারফত আলোচনা হয়েছে। তারা সব সময় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রেখেছেন। এখনো সেই যোগাযোগ অব্যাহত আছে।
ভারতের সেনাপ্রধানের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশ ছাড়ার এই প্রক্রিয়াটা দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় রেখেই সম্পন্ন হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির কারণে দুই দেশের যৌথ সামরিক মহড়ার বিষয়টি শুধু পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ভারতের সেনাপ্রধান। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেই তা আবার শুরু হবে বলে জানান তিনি।
জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেন, সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে বলা যায়, সেটি আবারো আগের মতোই চলছে। আমাদের কর্মকর্তারা সেখানে এনডিসিতে যোগ দিয়েছেন। এই বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। কেবল একটি বিষয় হল, যে যৌথ মহড়া চালানো হতো, এখনকার পরিস্থিতির কারণে আমরা কিছু সময়ের জন্য সেটি স্থগিত করেছি। পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেই মহড়াও হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের পর এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে কোনো রকম বিরূপ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি খুব একটি স্বাভাবিক নয়। প্রতিদিনই সেখানে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।
গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন অবসান হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যান। মিলিটারি এয়ারক্র্যাফটে করে দিল্লির কাছে হিন্ডন এয়ারবেসে এসে শেখ হাসিনা অবতরণ করেন। তখন থেকে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে তিনি ভারতেই রয়েছেন। বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকটি সীমান্তে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে উত্তেজনা আরো বেড়েছে।
বাংলাদেশ অভিযোগ করেছে, সীমান্তে এমন পাঁচটি নির্দিষ্ট স্থানে বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করছে ভারত যা সীমান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী দ্বিপাক্ষিক চুক্তির লঙ্ঘন।
পিপলসনিউজ/আরইউ