স্পেনে দ্রুতগতির দুটি ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
দেশটির কাস্তিয়া লা মাঞ্চা অঞ্চলের সরকার নিহতের এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে এ দুর্ঘটনায় ৩০ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছিল।
দুর্ঘটনার কারণে রাজধানী মাদ্রিদের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া অঞ্চলের উচ্চগতির রেল যোগাযোগ পুরোপুরি স্থগিত করেছে দেশটির রেল পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফ। স্থানীয় সময় বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ৯টার কিছু পর এই দুর্ঘটনা ঘটে।
কাস্তিয়া লা মাঞ্চা আঞ্চলিক সরকারের মুখপাত্র এস্থার পাদিয়া জানান, তোলেদো প্রদেশের উরদার কাছে মাদ্রিদ থেকে সেভিলেগামী রেলপথে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। সেখানে রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের একটি দ্রুতগতির এভিই ট্রেনের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থা ইরিওর দাঁড়িয়ে থাকা একটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। এতে ট্রেনের কয়েকটি বগি ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে যায় এবং দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়। দাঁড়িয়ে থাকা ইরিওর ট্রেনে একটি শিশুসহ ১৪৭ জন যাত্রী ছিলেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় রেনফের ট্রেনে যাত্রী ছিলেন ৩৯৭ জন।
দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বজনদের খোঁজে আহাজারি করতে দেখা গেছে অনেককে। আনা নামের এক নারী মাদ্রিদ থেকে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তিনি রয়টার্সকে জানান, তার স্বামী রেনফের এভিই ট্রেনের আট নম্বর বগিতে ছিলেন। স্বামীকে খুঁজতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ইরিও ট্রেনের যাত্রী ও ফিলিপাইনের পর্যটক ফ্রেডেরিক বাররিলেয়া নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, প্রচণ্ড ধাক্কায় মনে হয়েছিল আমি আসন থেকে উড়ে যাচ্ছি। তবে ট্রেনের দরজাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাওয়ায় আমি ও আমার স্ত্রী অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পেরেছি। আমাদের বগির যাত্রীদের আঘাত গুরুতর ছিল না। এর আগে একই ট্রেনের যাত্রী এদুয়ার্দা জানিয়েছিলেন, তিনি বগির যাত্রীদের ছিটকে পড়তে ও মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন।
ট্রেনের যাত্রী ছিলেন মিগুয়েল। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছেন তিনি। মিগুয়েল জানিয়েছেন, সহকর্মীদের সঙ্গে যাত্রা করছিলেন তিনি। ট্রেনের পেছনের কামরায় ছিলেন। হঠাৎ তীব্র শব্দ শোনেন। ট্রেন টলতে শুরু করে। ডান দিকের জানলা দিয়ে তিনি দেখতে পান, ভেঙেচুরে গেছে সামনের অংশ। অন্য ট্রেনটির ওই দশা হয়েছিল বলে প্রথমে মনে করেছিলেন তিনি। পরে দেখেন তার ট্রেনটিই পুরো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স, হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারী দলের পাশাপাশি শববাহী গাড়িও পৌঁছাতে দেখা গেছে। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য আশপাশের হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস সব কাজ বাতিল করেছেন। উদ্ধারকাজে সহায়তা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনাস্থলের সবচেয়ে কাছের শহর উরদা সফরে গেছেন তিনি। সেখানে সানচেস উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং পরে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেবেন। সানচেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা ও সংহতি জানান।
রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এক সময়ে স্পেনে এই দুর্ঘটনা ঘটল। আগামী ২৯ নভেম্বর দেশটিতে আগাম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিরোধী দলগুলোও আপাতত প্রচারকাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চলতি বছর স্পেনে এটি দ্বিতীয় বড় ট্রেন দুর্ঘটনা। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে একই রেলপথে একই দুই পরিচালনাকারী সংস্থার ট্রেনের মধ্যে দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। তবে চলতি বছরের এ দুটি দুর্ঘটনার আগে স্পেনের রেল সুরক্ষার রেকর্ড ইউরোপের মধ্যে অন্যতম সেরা ছিল। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের রেলপথে মৃত্যুহার ছিল ইউরোপের সর্বনিম্ন পর্যায়ের। এর আগে ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোসতেলা শহরের কাছে এক বড় ট্রেন দুর্ঘটনায় ৮০ জন নিহত ও ১৪৫ জন আহত হয়েছিলেন।
পিপলসনিউজ/আরইউ