অধিকার রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
প্রকাশ :
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে কেউ যেন বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। দেশের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঐক্য সুদৃঢ় করতে হলে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের চেতনা ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লব, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করেছে, জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষ কখনো আপস করেনি।
তারেক রহমানের ভাষ্য, ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চরম আকার ধারণ করে। ওই সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে গৃহবন্দি করা হয়। পরবর্তী সময়ে সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে সেই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ এবং সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা বিভিন্ন সময়ে অব্যাহত ছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে।
তিনি ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই। উভয় ক্ষেত্রেই দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতীয় স্বার্থে রাজপথে নেমে এসেছিল।
তারেক রহমান বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের পরিচয় একটাই—আমরা বাংলাদেশি। এই পরিচয়ই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
অভিভাবক হিসেবে তরুণদের সব সম্ভাবনা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি সমৃদ্ধ আগামী নির্মাণে অঙ্গীকারবদ্ধ।’
দেশের জনগণের প্রতি প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের ঐতিহাসিক এই দিনে দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী মানুষের উচ্চারণ হোক- ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কেউ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি : দেশে আবারো ষড়যন্ত্র হচ্ছে মন্তব্য করে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, একাত্তরের মতো, নব্বইয়ের মতো, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো আবারো দাঁতভাঙা জবাব আমরা দিতে চাই। ৭ নভেম্বরের বিপ্লব র্যালি হোক আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দিন, এই র্যালি হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার দিন। একই সঙ্গে যে গণতন্ত্রকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের মানুষ জীবন বিসর্জন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেই গণতন্ত্রকে রক্ষার দিন হোক।
শনিবার বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপির ‘সার্বভৌমত্ব শোভাযাত্রার’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ক্ষমতাসীন দলের এ কর্মসূচি ঘিরে কাকরাইল মোড় থেকে শুরু করে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত হাজারো নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ঢল জনসমুদ্রে রূপ নেয়। নেতাকর্মীদের কাছে সমর্থন চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা কি আমাদের সঙ্গে আছেন? এ সময়ে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানান।
এসময় তিনি বলেন, ‘আসুন বাংলাদেশের সকল গণতন্ত্রকারী মানুষকে নিয়ে আমরা যেকোনো ষড়যন্ত্র দেশের ভিতরেই হোক, দেশের বাইরেই হোক, সকল ষড়যন্ত্রের জবাব আমরা এক করে দিব। কোনো ষড়যন্ত্র করে মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।
তারেক রহমান বলেন, অতীতের মতো এখনো তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আবারো তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দাবিয়ে রাখতে চায়। আবার তারা আমি-ডামি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়। যে দেশের মানুষ ১৯৭১ ঘটনাতে পারে, যে দেশের মানুষ ১৯৭৫ সিপাহী-জনতার বিপ্লব ঘটাতে পারে, যে দেশের মানুষ ২০২৪ সালে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে, সে দেশের মানুষকে ষড়যন্ত্র করে দাবিয়ে রাখা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী এসময় শ্লোগান দেন, দিল্লী নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কেনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।
বেলা সোয়া ৩টায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী মঞ্চ থেকে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করে তিনি তাতে শামিল হন। শোভাযাত্রাটি কাকরাইলে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে দিয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হয়ে বাংলামোটর, ফার্মগেইট মোড় দিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভেনিউয়ে বিকাল সাড়ে ৪টায় শেষ হয়।
বেলা ৩টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী মঞ্চে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় মঞ্চে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
এ কর্মসূচি ঘিরে বেলা ১২টা থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা নয়াপল্টনে সমবেত হতে শুরু করেন।
নেতাকর্মীদের হাতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তাদের জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। বিভিন্ন রঙের ক্যাপ ও গেঞ্জি পরে শোভাযাত্রায় অংশ নেন তারা।
যারা পরাজিত হয়েছে তারা মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর থেকে যে মহল বাংলাদেশে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত...জনগণ তাদের পরাজিত করেছে। আবারও তারা ষড়যন্ত্র নিয়ে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। আসুন, এই জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, যেকোনো মূল্যে আমরা আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করব। এটাই হোক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রতিজ্ঞা। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, যত দিন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন এই বিপ্লবের র্যালি চলমান থাকবে।
দেশের সব গ্রাম ও ইউনিয়ন নিরাপদ রাখতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার দেশের প্রতিটি গ্রাম ও ইউনিয়ন পরিষদ নিরাপদ রাখতে কাজ করছে। গ্রামীণ জনপদ নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশও নিরাপদ থাকবে। আর তৃণমূল মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় গ্রাম পুলিশের ভূমিকা অনেক বেশি।
তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে কোথায় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, কোথায় অপরাধের আশঙ্কা রয়েছে, এসব বিষয়ে গ্রাম পুলিশ আগেভাগে তথ্য সংগ্রহ করে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে পারে।
৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত গ্রাম পুলিশদের মহাসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এর আগে সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে শনিবার বেলা পৌনে ১২ টার দিকে তেজগাঁওয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে যোগ দেন তিনি।
সমাবেশস্থলে প্রবেশ করেই সারাদেশ থেকে আসা গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে করতে মূল মঞ্চে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
মহাসমাবেশে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এখন থেকে একজন গ্রাম পুলিশ সদস্য মাসিক ১০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রাম পুলিশের প্রধান ১১ হাজার টাকা বেতন পাবেন। পাশাপাশি প্রত্যেক সদস্যকে প্রতি মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল বিল দেবে সরকার। নতুন এ সিদ্ধান্ত শনিবার থেকেই কার্যকর হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রাম পুলিশ সদস্যদের অবসরকালীন আনুতোষিক ভাতা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানের ক্ষেত্রে ৮০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রাম পুলিশ সদস্যদের যোগাযোগের সুবিধার্থে মোবাইল ফোন খরচ বাবদ ১৫০ টাকা মাসে দেওয়া হবে। পাশাপাশি থানায় যাতায়াত ভাতাও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে ৩০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পান। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছে। গ্রাম পুলিশ প্রধানদের ক্ষেত্রে এ ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে।
সরকার প্রধান বলেন, শুধু পদবি পরিবর্তন নয়, গ্রাম পুলিশের আর্থিক ও পেশাগত মর্যাদা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগে মহল্লাদার ও দফাদার হিসেবে পরিচিতদের এখন থেকে যথাক্রমে গ্রাম পুলিশ সদস্য ও গ্রাম পুলিশ প্রধান হিসেবে পরিচিত করা হবে।
প্রতিটি ইউনিয়নে দুজন করে নতুন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নারী গ্রাম পুলিশের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করা হবে।
গ্রাম পুলিশের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়নের একটি দীর্ঘ সড়ক গ্রাম পুলিশের নামে নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ওই সড়কের দুই পাশে গাছ লাগানো হবে। গাছ বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
এছাড়া গ্রাম পুলিশ সদস্যদের পাঁচ বছর পরপর সাইকেল দেওয়ার পরিবর্তে তিন থেকে সাড়ে তিন বছর পরপর নতুন সাইকেল দেওয়ার ব্যবস্থা করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেন।
মহাসমাবেশে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা প্রায় ৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্য অংশ নেন। তাদের ব্যাপক উপস্থিতিতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বিশাল সমাবেশের সৃষ্টি হয়। শেষে দেশের ৮ বিভাগ থেকে সেরা ৮ জন গ্রাম পুলিশ সদস্যকে সম্মাননা স্মারক ও অর্থ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
পিপলসনিউজ/আরইউ