দুদকের নতুন কমিশন নিয়োগে কাটবে কি মামলা জ্যাম ?
প্রকাশ : ১৯-০৮-২০২৬ ২০:৪৬
দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার বুধবার কার্যালয়ে প্রথম কর্মদিবস শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন/ ছবি : ষংগৃহীত।
সোহেলী চৌধুরী
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলার জট কি এবার কাটবে? দীর্ঘ সময় কমিশন কার্যত নেতৃত্বশূন্য থাকার পর নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণে দুদকের কার্যক্রমে গতি ফেরার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে পুরোনো মামলার চাপ, দীর্ঘসূত্রতা এবং তদন্তাধীন অভিযোগের পাহাড় সামলে নতুন কমিশন কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বুধবার (১৯ আগস্ট) দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামান এবং কমিশনার হিসেবে সাবেক সচিব ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। একই দিন তারা দুদক কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এর আগে গত ১৭ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ৭-এর উপধারা (১) অনুযায়ী তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামানকে চেয়ারম্যান এবং ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে কমিশনার করা হয়।
গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার পদত্যাগ করার পর নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সদস্যসচিব করে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ছয় দফা বৈঠক করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই ও যোগ্যতা পর্যালোচনার পর নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের নাম চূড়ান্ত করে।
ফলে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের নেতৃত্বশূন্যতার পর নতুন কমিশনের কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি দুদকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন অভিযোগ গ্রহণ নয়; বরং আগে থেকে পড়ে থাকা অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলাগুলো কোন প্রক্রিয়ায় দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে, সেটি নির্ধারণ করা।
দুদকের কাজের বড় অংশজুড়ে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ যাচাই, অনুসন্ধান, তদন্ত এবং মামলা পরিচালনা। কোনো অভিযোগ অনুসন্ধানে দীর্ঘ সময় লেগে গেলে পরবর্তী তদন্ত ও মামলা প্রক্রিয়াও পিছিয়ে যায়। আবার তদন্ত শেষ না হলে অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে একটি পর্যায়ে তৈরি হওয়া জট পরবর্তী ধাপগুলোতেও প্রভাব ফেলে।
তথ্য বলছে, নতুন কমিশনের সামনে পুরোনো অনুসন্ধান ও তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা একটি বড় কাজ হতে পারে। কোন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানাধীন, কোন মামলার তদন্ত শেষ হয়নি, কোন মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া বাকি এবং কোন মামলা আদালতে বিচারাধীন—এসব আলাদা করে চিহ্নিত না করলে মামলার জট কমানো কঠিন।
প্রশ্ন উঠছে, নতুন কমিশন কি পুরোনো মামলাগুলোর জন্য আলাদা অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে? নাকি নতুন করে আসা আলোচিত অভিযোগগুলোই কমিশনের কাজের বড় অংশ দখল করে নেবে?
অভিযোগ উঠছে, দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে একদিকে বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষা বাড়ে, অন্যদিকে দুদকের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত করতে গিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ে ঘাটতি থাকলে মামলার আইনগত ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামানের দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৫৯ সালের ১ মার্চ নওগাঁ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৩ সালে জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এবং ২০০১ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরে দীর্ঘদিন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আপিল বিভাগ থেকে অবসর নেন।
বিচারিক জীবনের এই অভিজ্ঞতা দুদকের মামলা, তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বিশেষ করে তদন্তের আইনগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা, মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা এবং আদালতে টেকসই মামলা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব এবং বিসিএস (প্রশাসন) ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা। ১৯৬৩ সালের ৬ জুলাই মানিকগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পিএইচডি করেন। ১৯৮৮ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট এবং পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারি চাকরির পাশাপাশি ২০১০ সাল থেকে দেশের কয়েকটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দুদকে যোগদানের আগে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে আইনের অধ্যাপক ছিলেন। একই সময়ে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রকল্পে লিগ্যাল এক্সপার্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তথ্য বলছে, প্রশাসন ও আইন—দুই ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের মামলার জট কমাতে শুধু অভিজ্ঞতা নয়, কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও সময়ভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণও জরুরি।
অপর কমিশনার ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৬৩ সালের ১৫ অক্টোবর কুমিল্লা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে বি.কম (সম্মান) ও এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ও এবি ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ, ব্যাংকিং বিভাগ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগ এবং আইবিএতে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ফিন্যান্স, বাণিজ্য, ক্যাশ ফ্লো, মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন, সম্পদ ও দায় মূল্যায়ন, ট্রান্সফার প্রাইসিং, মানিলন্ডারিং, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
দুদকের আর্থিক দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, অর্থপাচার ও মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধানে এই অভিজ্ঞতা কতটা কাজে আসে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে জটিল আর্থিক লেনদেনের নথি বিশ্লেষণ ও সম্পদের উৎস যাচাইয়ে তার পেশাগত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার সহধর্মিণী মিসেস শারমিন আফরোজা ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি উইমেন্স ফেডারেশন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছেন।
নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর দুদকের সামনে একসঙ্গে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ। পুরোনো অনুসন্ধান ও তদন্ত এগিয়ে নেওয়া, নতুন অভিযোগের দ্রুত যাচাই, গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সময়মতো তদন্ত শেষ করা এবং আদালতে মামলার কার্যকর অনুসরণ—সবকিছুর সমন্বয় করতে হবে।
সূত্র জানায়, নতুন কমিশনের শুরুতেই অনুসন্ধান ও তদন্তাধীন নথিগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হলে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা মামলাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে। এরপর মামলার গুরুত্ব, অর্থের পরিমাণ, অভিযোগের ধরন ও তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা সম্ভব।
প্রশ্ন উঠছে, নতুন কমিশন কি মামলার সংখ্যার দিকে বেশি নজর দেবে, নাকি তদন্তের মান ও দ্রুত নিষ্পত্তিকে অগ্রাধিকার দেবে? কারণ শুধু বেশি মামলা করা নয়, তদন্ত শেষ করে আদালতে তা প্রমাণের পর্যায়ে নেওয়াই দুদকের কার্যকারিতার বড় মাপকাঠি।
নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামান, কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান এবং কমিশনার ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার পেশাগত অভিজ্ঞতা ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। একজনের রয়েছে বিচারিক অভিজ্ঞতা, অন্যজনের প্রশাসন ও আইনের অভিজ্ঞতা এবং তৃতীয়জনের রয়েছে অর্থনীতি, রাজস্ব ও আর্থিক অপরাধসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা।
এখন দেখার বিষয়, এই তিন ধরনের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে নতুন কমিশন দুদকের পুরোনো মামলা ও তদন্তের জট কতটা কাটাতে পারে। শেষ পর্যন্ত নতুন কমিশনের সাফল্যের বড় মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘদিনের ‘মামলা জ্যাম’ কমিয়ে অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান গতি আনা।
পিপলসনিউজ/ এস.সি
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@peoplenewsbd.com