weather ২৬.৩৫ o সে. আদ্রতা ৯২% , শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘পানি খাইতে চাইছিল ছেলেটা, দিল না’

প্রকাশ : ২৪-০৮-২০২৫ ২১:৪১

ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চোর সন্দেহে ‘মব’ সৃষ্টি করে শুক্রবার (২২ আগস্ট) এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা ও দুজনকে আহত করার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় দুইজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদিকে ছেলে মো. রিহান মাহিনের (১৫) মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মা খাদিজা আকতার।

সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের মধ্যম কাঞ্চন নগর গ্রামের তালুকদার বাড়ির কাছে একটি চায়ের দোকানের সামনে ভিড়। দোকানি মুহাম্মদ লোকমান আর তার স্ত্রী খাদিজা আকতারকে ঘিরে আছেন উপস্থিত লোকজন। কাছে যেতেই শোনা গেল খাদিজার বিলাপের শব্দ। এক জোড়া স্যান্ডেল বুকে চেপে ধরে বলছিলেন, ‘আমার বুকের ধন, ছেলেটা শেষ মুহূর্তে একটু পানি চাইছিল। তাও দিতে দেয় নাই তারা। আমর সামনে পিটাই পিটাই ছেলেরে মারছে।’

রিহানের বাবা মুহাম্মদ লোকমান স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ক্যানটিন চালান। বাড়তি রোজগারের জন্য ছয় মাসে আগে বাড়ির পাশে চায়ের দোকান দেন। স্কুল ছুটি শেষে সেখানে সময় দিতো রিহান, বেচাবিক্রিতে সহযোগিতা করতো বাবাকে। সেই দোকানের সামনেই শনিবার দুপুরে তার মা-বাবাকে পাওয়া গেল। শোকে মুহ্যমান এই দম্পতির আহাজারি যেন কোনোভাবেই থামছিল না।

খাদিজা বিলাপ করতে করতে রিহানের জন্মের কথা বলে যাচ্ছিলেন। ছেলে তার অনেক সাধনার ধন। এর আগে পরপর তিন সন্তান মৃত ভূমিষ্ঠ হয়েছে। এরপর ছেলেটি কোল আলো করে এলো। রিহানের জন্ম তাই মায়ের কাছে বিশ্বজয়ের মতো ঘটনা। আদরের ধনকে কোরআনে হাফেজ বানাতে চেয়েছিলেন তিনি। বড় মানুষ করতে চেয়েছিলেন। সেসব কথা বলতে বলতে ‘ও রেহান রে, ও রেহান’ এমন আর্তনাদ বেরিয়ে আসছিল মা খাদিজার কণ্ঠ চিরে।

এদিকে খাদিজা আকতারের দুঃখ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ছেলের আনা এক জোড়া চুড়ি। গত মঙ্গলবার রাতে বাজার থেকে মায়ের জন্য হাতের চুড়ি কিনে এনেছিল রিহান। খুশিতে চোখ ভিজে গিয়েছিল মায়ের। কে জানত, সেই চুড়িই হবে তার সন্তানের শেষ উপহার? বুধবার সকালে মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আরো দুই বন্ধু স্কুলছাত্র মুহাম্মদ রাহাত, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মুহাম্মদ মানিকসহ বেড়াতে গিয়েছিল কক্সবাজারে। দুই দিন সমুদ্র সৈকতে আনন্দ করে বৃহস্পতিবার রাতে বাড়িতে ফিরে আসছিল তারা তিন সমবয়সী বন্ধু। তাদের কল্পনাতেই আসেনি, এই ফেরাটা হবে মৃত্যুর দিকে যাত্রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ভোর ৪টায় একটি অটোরিকশা নিয়ে বাড়ির সামনে রিহানের বাবার চা- দোকানের পাশে নামে তিন কিশোর। এ সময় হঠাৎ চোর চোর বলে তাদের ধাওয়া করেন লাঠিসোঁটা হাতে থাকা সাত থেকে আটজন। তাদের পিটুনি থেকে বাঁচতে রিহানরা দৌড়ে আশ্রয় নেয় নিজের বাড়ি থেকে ২০০ গজ দূরের নির্মাণাধীন একটি দোতলা বাড়ির ছাদে। পরে সেখান থেকে তাদের ধরে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে নিয়ে নেওয়া হয় একটি সেতুর উপর। সেখানে তিনজনকে বেঁধে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে পেটানো হয় তিনজনকে। মারধরে মৃত্যু হয় রিহানের। শুক্রবার সন্ধ্যায় রিহানকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

রিহানের বাবা মুহাম্মদ লোকমান বলেন, ‘আসামিরা এখন বাঁচতে আমাদের টাকার অফার করছেন মামলা না করতে। ১০ লাখ লাগলে দেবে বলছে। কিন্তু আমি ছেলে বিক্রি করবো না।’

কেন রিহানদের এভাবে পেটানো হলো, কেবলই চোর সন্দেহে? এ বিষয়ে স্থানীয় লোকজন বলেন, ভিন্ন পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব ছিল বলেই কিশোরদের পেটানো হয়। খাদিজা আকতারও বিলাপের সুরে সে কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, ‘শুধু অন্য গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কেন করছে, সেই জন্য মারছে তাদের। শুধু সেই কারণে। আমি এখন কিছু চাই না। শুধু আসামিদের ফাঁসি চাই।’

এদিকে এ ঘটনায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন নিহত কিশোরের মা খাদিজা বেগম। মুহাম্মদ নোমান (২২) ও মুহাম্মদ আজাদ (২৩) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্য তিন আসামি হলেন- নাজিম উদ্দিন, মোহাম্মদ তৈয়ব ও মহিউদ্দিন। তারা সবাই কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের মধ্যম কাঞ্চন নগর গ্রামের বাসিন্দা।

পুলিশের ধারণা, পূর্বের বিরোধ থেকে চোর সন্দেহের নাটক সাজিয়ে ওই কিশোরদের পেটানো হয়েছে। আসামিদের বাড়ি রিহানদের বাড়ি থেকে ৩০০ মিটার দূরে। শনিবার দুপুরে আসামিদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশীরা জানান, তারা পরিবারসহ পালিয়ে গেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গ্রেপ্তার মুহাম্মদ আজাদের সঙ্গে ১৫ দিন আগে রিহানের চা-দোকানে তর্কাতর্কি হয়। সেই ক্ষোভ থেকেও ঘটনাটি ঘটতে পারে। তারা বলেন, রিহান মারা যায় সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে। এলাকার শত শত মানুষ জড়ো হলেও কেউ কিছু করতে পারেননি। কারণ, আসামিরা পাশে ঘেঁষতে দেননি কাউকে। পাশাপাশি যারা ফোনে ছবি বা ভিডিও করেছেন দূর থেকে, সেগুলো তারা কেটে দিয়েছেন। কাউকে কাউকে ছবি তোলায় মারধরও করেছেন।

এদিকে পিটুনিতে আহত অন্য দুই কিশোর রাহাত ও মানিকের বাড়ি ঘটনাস্থল থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। এই দুজনের বাড়ি মাইজপাড়ায়। ছেলেদের চিকিৎসার জন্য দুজনের মা-বাবা চট্টগ্রাম নগরে অবস্থান করছিলেন।

মানিকের দাদি নসিমা খাতুন বলেন, তার নাতি গ্রামের একটি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। এ রকম ছাত্র কিশোরকে যারা বেঁধে মারলেন, তাদের শাস্তি চান তিনি।

রাহাতের চাচা মুহাম্মদ আইয়ুব সওদাগর বলেন, তার ভাতিজা স্থানীয় স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ভাতিজারা তিন বন্ধু কক্সবাজার থেকে বাড়িতে এলে বিপথগামী যুবকদের হাতে নির্মম ঘটনার শিকার হয়। তিনি এ ঘটনার সঠিক বিচার দাবি করেন।

মাইজপাড়ার বাসিন্দা ও রাহাতের চাচা তাজুল ইসলাম বলেন, মাইজপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মধ্যম কাঞ্চননগরের ছেলেদের বন্ধুত্ব কেন হবে, এটা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল দুটি পক্ষের। এর জের ধরে ছেলেগুলোকে বেঁধে মারা হলো।

এদিকে শনিবার বেলা দুইটায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলামসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। পুলিশ সুপার নিহত রিহানের বাবাকে সান্ত্বনা দেন এবং হত্যাকারী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেন।

পিপলসনিউজ/আরইউ

-- বিজ্ঞাপন --


CONTACT

ads@peoplenewsbd.com

কোনো সরকারপ্রধান ‘ভিক্ষার ঝুলি’নিয়ে যান না : চীন সফর নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো সরকারপ্রধান ‘ভিক্ষার ঝুলি’নিয়ে যান না : চীন সফর নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতালিতে স্বামী-স্ত্রী-মেয়ে খুন,নোয়াখালীর বাড়িতে এসেছিল হত্যার হুমকি ইতালিতে স্বামী-স্ত্রী-মেয়ে খুন,নোয়াখালীর বাড়িতে এসেছিল হত্যার হুমকি হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৭০৮ হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৭০৮ গ্রাম-শহরের সব প্রতিবন্ধী শিশু আসবে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার আওতায়, প্রকল্প চূড়ান্ত : স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী গ্রাম-শহরের সব প্রতিবন্ধী শিশু আসবে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার আওতায়, প্রকল্প চূড়ান্ত : স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী আসামির দায়ের কোপে লালমনিরহাটে দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত আসামির দায়ের কোপে লালমনিরহাটে দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত