গাজীপুরে বেক্সিমকোর শ্রমিকদের যানবাহন ভাঙচুর ও আগুন
প্রকাশ : ২৩-০১-২০২৫ ০০:০৩

ছবি : সংগৃহীত
গাজীপুর প্রতিনিধি
গাজীপুর নগরের সারাব এলাকার বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বন্ধ হওয়া ১৬টি কারখানা চালুর দাবিতে আবারো বিক্ষোভ শুরু করেছেন শ্রমিকেরা। বুধবার (২২ জানুয়ারি) বিকালে শ্রমিকেরা উত্তেজিত হয়ে চন্দ্রা-নবীনগর সড়কে অবস্থান নিয়ে অর্ধশতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করেন। তারা একটি মালভর্তি ট্রাক ও তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ করেন। ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে শ্রমিকদের হামলায় তিন সংবাদকর্মী আহত হন।
শ্রমিকদের অবরোধের কারণে সড়কের উভয় দিকে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে সড়কে চলাচলকারী যান চালক ও যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে রাত পৌনে আটটার দিকে সড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এ ঘটনার মধ্যে নগরের তেঁতুইবাড়িতে ‘গ্রামীণ ফেব্রিকস’ নামের একটি কারখানার পাঁচতলা ভবনের নিচতলায় অগ্নিসংযোগ করে উত্তেজিত শ্রমিকদের একটি অংশ। পরে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়।
এদিকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়ে এলসি সুবিধা চালু করার দাবি নিয়ে বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলন করবে বেক্সিমকো গ্রুপ।
শিল্প পুলিশ ও কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্ধ হওয়া ১৬টি কারখানা চালুর দাবিতে গত মঙ্গলবার গণসমাবেশ করেন কারখানার শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। শ্রীপুরের সান সিটির মাঠে আয়োজিত ওই সমাবেশ থেকে প্রতিষ্ঠানটির ৪২ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর জীবন-জীবিকার স্বার্থে বন্ধ কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার বিকালে আবার শ্রমিকেরা সানসিটি মাঠে সমাবেশ শুরু করেন। সমাবেশের একপর্যায়ে শ্রমিকদের একটি পক্ষ চক্রবর্তী এলাকায় চন্দ্রা-নবীনগর সড়ক অবরোধ করে গাছের গুঁড়িতে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় উত্তেজিত শ্রমিকেরা সড়কে চলাচলরত অর্ধশতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে মালবোঝাই একটি ট্রাক ও তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
শ্রমিকদের অবরোধের খবর সংগ্রহ করতে গেলে দীপ্ত টিভির গাজীপুরের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম, প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার কালিয়াকৈর প্রতিনিধি আবু সাইদ, বাংলা ভিশনের চিত্রসাংবাদিক আমির হোসেনকে বেধড়ক পেটানো হয়। তাদের ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন শ্রমিকেরা।
খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শ্রমিকেরা উত্তেজিত হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। পরে রাত পৌনে আটটার দিকে চন্দ্রা-নবীনগর সড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
আন্দোলনকারী আনোয়ার হোসেন নামের এক শ্রমিক বলেন, আমাদের কেউ রাস্তায় নামতে চান না। কিন্তু বাধ্য হয়ে ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমেছি। আমরা এখন বাসা ভাড়া দিতে পারছি না। পরিবারের জন্য বাজার করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে কোনোভাবে দিন পার করছি। আমরা আর এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারছি না। আমাদের দাবি মেনে নেওয়া না হলে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।
পরিবহন শ্রমিক আব্দুল খালেক জানান, শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে মহাসড়কে বেছে নেয়। তারা যানবাহন ভাঙচুর করেন। এতে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সারাদিন রাস্তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূর আলম জানান, শ্রমিক আন্দোলন গাজীপুর এলাকার হলেও সাভার ও আশুলিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এ অঞ্চলেও উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন।
কাশিমপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের একটি পক্ষ চন্দ্রা-নবীনগর সড়ক অবরোধ করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে তারা সড়কে যানবাহন ভাঙচুর শুরু করেন। এ সময় কিছু দুষ্কৃতকারী একটি ট্রাক ও তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আবু তালেব বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছি। এখন যান চলাচল স্বাভাবিক আছে। শ্রমিকেরা বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করেছেন। কয়েকটিতে অগ্নিসংযোগ করেছেন। ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন আছে।’
এদিকে চন্দ্রা-নবীনগর সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে নগরের তেঁতুইবাড়িতে ‘গ্রামীণ ফেব্রিকস’ নামের একটি কারখানায় আগুন দেয় শ্রমিকদের একটি পক্ষ। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়।
বেক্সিমকো গ্রুপের মানব সম্পদ উন্নয়ন ও প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম গণপরিবহন ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৫ ডিসেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বেক্সিমকোর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের কমিটির সভার সিদ্ধান্তের পর বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৬টি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। বন্ধের কারণ হিসেবে সরকার জানায়, কারখানাগুলোতে ক্রয়াদেশ না থাকা ও ব্যাংকে ঋণখেলাপি থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না।
এলসি চালুর দাবি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসছে বেক্সিমকো
কাঁচামালের সংকটের কারণ দেখিয়ে কারখানা ‘লে-অফ’ করে রাখা বেক্সিমকো সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর আল রাজি কমপ্লেক্সে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন হবে।
গত ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থ্যানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানিগুলোতে অস্থিরতা চলছে। শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে বন্ধ রাখা হয়েছে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কয়েকটি কারখানা।
সংবাদ সম্মেলনের কারণ জানতে চাইলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো গ্রুপের মানব সম্পদ উন্নয়ন ও প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, কাঁচামাল তো নেই। এলসি খুলতে পারছি না কোনো ব্যাংকে। আমরা কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়ে এলসি সুবিধা চালু করার দাবি জানাব সরকারের কাছে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং সুবিধা সচল করতে পারলেই কারখানা খোলা সম্ভব হবে। আমরা চাই এলসি করার সুযোগ দিক সরকার।
জানুয়ারির ৩০ তারিখ পর্যন্ত লে-অফ ঘোষণা করা আছে বেক্সিমকো লিমিটেড। এর আগেই কারখানা খুলতে এলসি চালুর দাবি করছে তারা।
পিপলসনিউজ/আরইউ
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@peoplenewsbd.com