স্কুলে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ, সেই শারমিন একাডেমিতে তালা
প্রকাশ : ২২-০১-২০২৬ ১৪:০৬
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকায় এক শিশুশিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এ ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে ‘শারমিন একাডেমি’। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এবার স্কুলটিতে তালা ঝুলিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশি তদন্ত শুরুর পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ব্যবহৃত সব কটি যোগাযোগ নম্বরও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে নয়াপল্টনের ওই এলাকা ও স্কুল প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, স্কুল প্রাঙ্গণ ফাঁকা, নেই শিক্ষার্থী বা শিক্ষক। মাঝেমধ্যে দুই-একজন অভিভাবক ও কৌতূহলী পথচারী এসে তালাবদ্ধ স্কুলের ভেতরে উঁকি দিচ্ছেন।
স্কুল ভবনের কেয়ারটেকার কামরুল হক জানান, বুধবার (২১ জানুয়ারি) পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি খোলা থাকলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কাউকে আসতে দেখেননি তিনি। কেন হঠাৎ স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। এর আগে শারমিন একাডেমির ভেতরে এক শিশুকে বেধড়ক মারধরের একটি ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়।
তাতে দেখা যায়, গোলাপি রঙের শাড়ি পরা এক নারী (যাকে শিক্ষক বলে ধারণা করা হচ্ছে) স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত আনুমানিক তিন থেকে চার বছর বয়সী এক শিশুকে টেনে একটি অফিস কক্ষে নিয়ে আসেন। এরপর শিশুটিকে একটি টেবিলের পেছনে বসে থাকা এক পুরুষের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকেও শিক্ষক বলে মনে করা হচ্ছে।
ভিডিওতে আরো দেখা যায়, সোফায় বসিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত শিশুটিকে বারবার চড় মারছেন এবং ধমক দিচ্ছেন ওই নারী। এক পর্যায়ে ওই পুরুষ শিক্ষক একটি স্ট্যাপলার হাতে শিশুটির কাছে এগিয়ে গিয়ে তার মুখে স্ট্যাপল করে দেওয়ার হুমকি দেন। পুরো ঘটনার সময় শিশুটির মধ্যে চরম ভয় ও মানসিক আতঙ্কের লক্ষণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ঘটনাটি শাস্তির নামে নিষ্ঠুরতার অভিযোগকে আরো জোরালো করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ১৮ জানুয়ারি দুপুর আনুমানিক ১২টা ৫১ মিনিটে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, ভিডিওটি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ঘটনাটি নয়াপল্টনের শারমিন একাডেমিতেই ঘটেছে। পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছে।
পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। যাচাই-বাছাই করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি এটি শারমিন একাডেমির ঘটনা। নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের থানায় আসার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তবে তারা সময়ক্ষেপণ করছে।’ তিনি আরো জানান, এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শারমিন আক্তারসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষককে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার হুসাইন মো. ফারাবী জানান, মঙ্গলবার ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শোনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এখনো পরিবারগুলো মামলা বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে সম্মত হয়নি। তারা চাইলে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে মামলা গ্রহণ করা হবে।বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন রোধে আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী শিশুর প্রতি যেকোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনা পারিবারিক বা সামাজিক ‘শৃঙ্খলা রক্ষার’ অজুহাতে ধামাচাপা পড়ে যায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। ফলে বিচার প্রক্রিয়া দেরিতে শুরু হয় এবং অনেক সময় অভিযুক্তরা শাস্তির বাইরে থেকে যায়। শিশুদের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা এ ধরনের ঘটনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পিপলসনিউজ/আরইউ
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@peoplenewsbd.com