কান উৎসব সফলে তোড়জোড়, ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী জুরিপ্রধান জুলিয়েট
প্রকাশ : ১৯-০২-২০২৫ ০০:৩২

ছবি : সংগৃহীত
সোহেলী চৌধুরী
চলচ্চিত্রের মর্যাদাপূর্ণ আসর কান চলচ্চিত্র উৎসব। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এবং প্রভাবশালী চলচ্চিত্র উৎসবও বলা হয় তাকে। প্রতি বছরের মে মাসে চলচ্চিত্রের মর্যাদাপূর্ণ এ আসর ফ্রান্সের রিজোর্ট শহর কানে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৬ সাল থেকে প্রতি বছর এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত নবীন-প্রবীণ অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা, কলাকুশলীদের আড্ডায় মুখর থাকে এ উৎসব। কানে চাইলে যে কেউ চলচ্চিত্র জমা দিতে পারেন এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রতিনিধিদের সেটি দেখার সম্ভাবনা থাকে। ভালো লেগে গেলে নতুন নির্মাতাদের জন্য মিলে যেতে পারে বিনিয়োগ। কোয়েন্টিন টারান্টিনো, স্টিভেন সডারবার্গের মতো পরিচালকের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল কান চলচ্চিত্র উৎসবের মাধ্যমে। এবারো উৎসব সফলভাবে আয়োজনে শুরু হয়েছে তোড়জোড়।
৭৮তম কান চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হবে ১৩ মে। চলবে ২৪ মে পর্যন্ত। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে জানা যাবে বিভিন্ন শাখায় নির্বাচিত সিনেমার তালিকা। উৎসব পরিচালক থিঁয়োরি ফ্রেমো এসব জানিয়েছেন।
তবে ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকেই জানা গেল এবারের আসরের জুরিবোর্ডের প্রধানের নাম। ফ্রান্সের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ৬০ বছর বয়সী জুলিয়েট বিনোশ এবার অনুষ্ঠিতব্য আসরের জুরি বোর্ডের দলনেতা। এর মধ্য দিয়ে কানের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার কোনো নারী জুরিপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন। এর আগে বার্বিখ্যাত পরিচালক গ্রেটা গারউইগ প্রথম নারী হিসেবে জুরির সভাপতির আসনে বসেন।
গত বছর সম্মানজনক স্বর্ণপাম পান অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ। তার হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন অভিনেত্রী জুলিয়েট বিনোশ। এর এক বছর পরই বিচারক হওয়ার খবর যেন স্বপ্নের মতো এই অভিনেত্রীর কাছে। তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন বলেন, ‘জুরি হয়ে অন্য সদস্যদের সঙ্গে এগিয়ে যেতে চাই, ভাগাভাগি করতে চাই জীবনের অভিজ্ঞতা।’ এ সময় তিনি কান উৎসবে প্রথম অংশগ্রহণের স্মৃতি তুলে ধরেন। তার কাছে এভাবে ফেরা যেন অকল্পনীয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ভ্যারাইটিকে এই অভিনেত্রী বলেন, ‘তখন ১৯৮৫ সাল। সেই সময়ে ক্যারিয়ার নিয়ে একধরনের উদ্দীপনা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ৪০ বছর আগের ঘটনা। সেই প্রথম তরুণ অভিনেত্রী হিসেবে কান উৎসবে পা রাখি। জীবনে কল্পনাও করিনি, ৪০ বছর পর উৎসবের এ সম্মানের জায়গায় বসব।’ এ সময় বিশেষ এ দায়িত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
১৯৮৩ সালে লিবার্টি বেল সিনেমা দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন বিনোশ। দুই বছর পরই সুযোগ পেয়ে যান প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের। নাম লেখান রঁদেভু সিনেমায়। এটি কান উৎসবে স্বর্ণপাম পুরস্কারের জন্য প্রতিযোগিতা করে। সেই সুবাদে উৎসবে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পান বিনোশ। সেই প্রথম কানের লালগালিচায় হাঁটা। পরে আর ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে হয়নি। চার দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি ৭০টির মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন।
অস্কারে দুবার মনোনয়ন পান বিনোশ। দ্য ইংলিশ পেশেন্ট সিনেমাটি তাকে পার্শ্বচরিত্রে অস্কার পুরস্কার এনে দেয়। এছাড়া সিনেমাটির জন্য বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব ও বাফটা থেকে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। সার্টিফায়েড কপি সিনেমার জন্য জিতেছিলেন কান উৎসব থেকে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। একের পর এক তার ক্যারিয়ারে প্রাপ্তির খাতা ভারী হতে থাকে।
সম্প্রতি ইউরোপিয়ান ফিল্ম একাডেমির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি মাইকেল হ্যানাকে, ডেভিড ক্রোনেনবার্গ, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, হিরোকাজু কোরে-এডাসহ অনেক বিখ্যাত নির্মাতার সঙ্গে কাজ করেছেন।
কান উৎসবের শুরু: বিখ্যাত লেখক ফিলিপ্পে এরল্যাঙ্গার ১৯৩৮ সালে প্রথম কান উৎসব আয়োজনের ধারণা দেন। ১৯৩৯ সালে হওয়ার কথা ছিল প্রথম আসর। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধের পরিবেশ পেরিয়ে ১৯৪৬ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে বসে প্রথম আসর। আসরের সেরা পুরস্কার ‘পাম দি’অর’ বা ‘স্বর্ণপাম’ প্রথম প্রদান করা হয় ১৯৫৫ সালে। সুইস জুয়েলারি কোম্পানি চোপার্ড ১৯৯৭ সালে পুরস্কারটিকে আধুনিকীকরণ করে। এতে বসানো হয় ২৪ ক্যারেটের সোনা ও ক্রিস্টাল।
১২ দিনের উৎসব: ভূমধ্যসাগরের উপকূলে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের শহর কানে বসে চলচ্চিত্রজগতের সবচেয়ে সম্মানজনক এ আসর। প্রতিবছরের মে মাসে ১২ দিনের জন্য বসে এ আসর।
১৯৪৬ সালে শুরুর পর থেকে প্রতিবছর সেরা চলচ্চিত্রকে পুরস্কৃত করা হয়। এটি বিশ্বের চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজকদের অন্যতম একটি মিলনমেলা। এটি বিশেষভাবে পরিচিত পাম দি’অর পুরস্কারের জন্য, যা দেওয়া হয় মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রকে। প্যালেস অব ফেস্টিভ্যালে বসে প্রতিযোগিতা বিভাগের আসর।
সিনেমা নির্বাচন: প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার সিনেমা জমা পড়ে এবং সিলেকশন কমিটি প্রতিটি সিনেমা দেখে। সেখান থেকে ৫৬টি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ও ১৪টি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা অফিশিয়াল সিলেকশনের জন্য নির্বাচন করে। কানের মূল আসরে মূলত এই ৭০টি সিনেমাই প্রদর্শন করানো হয়।
অফিশিয়াল সিলেকশনের জন্য যে সিনেমাগুলো নির্বাচন করা হয়, সেগুলো বেশ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়- ১. কম্পিটিশিন: ফিচার ফিল্মস অ্যান্ড শর্টফিল্মস; ২. ফিচার ফিল্মস আউট অব কম্পিটিশন; ৩. আঁ সার্ত্রে রিগা ও ৪. সিনেফনডেশন।
একটি সিনেমা প্রতিযোগিতা করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় মেনে চলতে হয়। মূল প্রতিযোগিতা, আউট অব কম্পিটিশিন কিংবা আঁ সার্ত্রে রিগা-যে বিভাগেই হোক না কেন, এটি অবশ্যই উৎসবে জমা দেওয়ার অন্তত ১২ মাসের মধ্যে নির্মিত হতে হবে। সিনেমাটি কোনো আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, এমনকি যে দেশে তৈরি হচ্ছে, সেই দেশেও প্রদর্শন করানো যাবে না। পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলেও স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ১৫ মিনিটের বেশি হতে পারবে না।
আউট অব কম্পিটিশন বিভাগে যেসব সিনেমা প্রদর্শিত হয়, সেগুলো কান সিলেকশন কমিটি নির্বাচন করে দিলেও প্রতিযোগিতার মানদণ্ড মেনে চলার ব্যাপারে তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আঁ সার্ত্রে রিগায় প্রদর্শিত সিনেমাগুলো নির্মাতার প্রথম সিনেমা হতে হয় এবং এর মাধ্যমে নির্মাতার পরীক্ষামূলক কৌশল ও প্রগতিশীল ভাবনা ফুটে ওঠে।
১৯৯৮ সালে চালু হয় সিনেফনডেশন বিভাগ। এ বিভাগে বিশ্বের চলচ্চিত্র স্কুলের ছাত্ররা তার সিনেমা জমা দিতে পারেন। এখানে প্রদর্শিত সিনেমাগুলো মূলত কল্পকাহিনী, বাস্তবতানির্ভর কিংবা অ্যানিমেশনধর্মী হতে হয়। দৈর্ঘ্য হতে হবে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা।
জুরি: কানের অফিশিয়াল জুরি দুই ভাগে বিভক্ত- দ্য ফিচার ফিল্মস জুরি ও দ্য শর্টফিল্মস অ্যান্ড সিনেফনডেশন জুরি। গোপন ব্যালটে ভোট হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। জুরি সদস্য যারা থাকেন, প্রতিযোগিতায় তাদের কোনো সিনেমা থাকতে পারে না।
জুরি সদস্য নির্বাচন করা হয় সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে। অফিশিয়াল জুরি করা হয় সাম্প্রতিক কালে চলচ্চিত্রজগতে যারা নিজেদের কাজ দিয়ে আলোচনায় রয়েছেন, তাদের। জুরিবোর্ডের সদস্য হতে পারা খুবই সম্মানজনক একটি ব্যাপার। প্রধান জুরি হতে পারাটা আরো বেশি সম্মানের।
একনজরে: এ উৎসব ২০০২ সাল থেকে কান চলচ্চিত্র উৎসব নামে পরিচিতি পায়। এর আগে এটি পরিচিত ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ নামে। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ৮০ হাজার মানুষ কানে আমন্ত্রিত হয়েছেন; গত বছরের উৎসবের হিসাব ধরা হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চার হাজার সাংবাদিক কানে আমন্ত্রিত হয়েছেন। পাঁচ হাজার সিনেমা প্রদর্শিত হয়েছে এবং ২০০ সিনেমা পাম দি’অর বা স্বর্ণপামের জন্য লড়াই করেছে। স্বর্ণপামের অর্থমূল্য প্রায় ২৬ লাখ টাকা। কানের লালগালিচা ১৮০ মিটার বিস্তৃত। ৮৯টি দেশ কানের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিবছর কানের আয়োজন সম্পন্ন করতে এক হাজার মানুষ কাজ করেন।
পিপলসনিউজ/আরইউ
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@peoplenewsbd.com