weather ২৯.৯৯ o সে. আদ্রতা ৭৪% , মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনজীবনে নানামুখী চাপ

প্রকাশ :

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনজীবনে নানামুখী চাপ

ছবি : সংগৃহীত

রায়হান উল্লাহ
আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং পরিবহন ও বিমা খরচ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। দেশের বাজারে ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২ থেকে প্রায় ৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি। 

এই সমন্বয়ের পেছনে সরকারের প্রধান যুক্তি হলো বিপুল পরিমাণ লোকসান ও ভর্তুকির চাপ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানান, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসিকে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে এবং মূল্য সমন্বয়ের পরও ডিজেলে লিটারপ্রতি প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তেলের মূল্য না বাড়ালে বছরে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করত।

তবে সরকারের জন্য এটি ‘উপায়হীন সিদ্ধান্ত’ ও প্রতিমন্ত্রীর আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ সত্ত্বেও, হুট করে দাম বাড়ায় তাৎক্ষণিকভাবেই এর তীব্র প্রভাব পড়েছে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন খাতে। দূরপাল্লার বাসে ১০০ কিলোমিটারে কেবল ডিজেল খরচই বাড়ছে প্রায় ৫৭১ টাকা; ফলে কোনো নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের আগেই টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে বেনাপোল স্থলবন্দরে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর এই যাতায়াত খরচের চাপ পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মতো রাজনৈতিক দলগুলো। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশে বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি আরো মারাত্মক আকার ধারণ করবে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়ে আধা-ডুবন্ত নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ নিঃশেষ হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা পরিবহন খাতের নৈরাজ্য রুখতে কঠোর মনিটরিং, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যাপ্তি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না-জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। একই সঙ্গে দাম বাড়ানোর কারণে জনগণের যে কষ্ট হবে, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

সোমবার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আমাদের সামনে আবির্ভূত হচ্ছে। এর ফলে বিমার প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। এ অবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের পক্ষে এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা বারবারই বলেছিলাম যে উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না কিংবা নেবে না।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এরকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। জনগণের জীবনমানের কষ্ট লাঘবের অভিপ্রায়ে রাজনীতিতে এসেছি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জনগণের যে কষ্ট হবে, এটি আমি উপলব্ধি করি। সেই কারণে জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।

তিনি বলেন, সরকার উপায়হীন না হলে এমন অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে চাইতো না। তবে চলমান সংকট দ্রুত কেটে যাবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবারও সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দামে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে। নতুন দাম সোমবার থেকেই কার্যকর হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করতে পারায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ৪৫ লাখ টন ডিজেল। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম গড়ে প্রায় ২০৫ টাকা লিটার। মূল্য সমন্বয়ের আগে দেশে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। ফলে প্রতি লিটারে প্রায় ৯০ টাকা ভর্তুকি বা লোকসান দিতে হচ্ছিল। মূল্য সমন্বয়ের পরও বিপিসিকে গড়ে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

প্রতি লিটার ডিজেলে ৯০ টাকা লোকসানে বিপিসি-বিপিসি চেয়ারম্যান : প্রতি লিটার ডিজেলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ৯০ টাকা লোকসান করছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম সমন্বয় করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

সোমবার গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান বিপিসি চেয়ারম্যান।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ, বিক্ষোভ করল তিন দল : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এবি পার্টি। এ ছাড়া পৃথক বিক্ষোভ মিছিল করেছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টায় জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল করে। এ ছাড়া সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর বাংলামোটর এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে এনসিপি। সন্ধ্যা ৭টায় পল্টন মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

‘কাল ৫০০ দিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম, এখন ১০০ টাকা বেশি ভাড়া নিল’ : ‘কালকে (রোববার) ৫০০ টাকা দিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম। আর এক দিন পর এখন ১০০ টাকা বেশি ভাড়া নিল। ৬০০ টাকায় টিকিট কাটতে হলো। কদিন আগেও একবার ভাড়া বাড়ছিল। এখন আবার বাড়ায় দিল।’

কথাগুলো বলছিলেন মো. রমজান। সোমবার সকালে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে তার সঙ্গে দেখা হয়। ঈগল পরিবহনের একটি বাসে টিকিট কেটেছিলেন তিনি। ঢাকা থেকে যাচ্ছিলেন মাগুরায়।

বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে এই যাত্রী ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘গাড়ির লোকেরা এর চেয়ে কম ভাড়া নেবে না। সরকার তেলের দাম বাড়াইছে। তাই তারাও ভাড়া বাড়াইছে। চাপটা বাড়ল আমাদের।’

গাবতলী বাস টার্মিনালের কাউন্টারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, টার্মিনাল ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন রুটের বাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়। 

বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জি আর শহীদ বলেন, আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। বিআরটিএ কিংবা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে ভাড়ার নতুন তালিকা ঠিক করা হবে।

বেনাপোলে ট্রাক ভাড়া বেড়েছে পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা : জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে। এখান থেকে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। স্থানভেদে ট্রাকপ্রতি ভাড়া পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা বলছেন।

বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন শত শত আমদানি-রপ্তানি ট্রাক চলাচল করে। প্রতিদিন অন্তত পাঁচ শতাধিক ট্রাক বন্দর থেকে আমদানি পণ্য নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে যায়। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন।

সোমবার সকাল থেকেই ভাড়া নিয়ে ট্রাক চালকদের সঙ্গে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের বাকবিতণ্ডা চলে।

বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর হলো বেনাপোল। প্রতিদিন এই বন্দর দিয়ে সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং এক থেকে দেড়শ ট্রাক পণ্য রফতানি হয়ে থাকে। তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানি-রপ্তানি পণ্য আমরা দেশের বিভিন্ন জেলা ও দেশের বাইরে পাঠাতে পারছি না।

বন্দরের পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে গন্তব্য অনুযায়ী ভাড়া বেড়েছে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় জিনিসপত্রের দামও বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন তারা।

রোববার বেনাপোল থেকে ঢাকায় ১৫ টন পণ্য পরিবহনে জন্য ট্রাক ভাড়া ছিল ২১-২২ হাজার টাকা। মধ্যরাত থেকে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সোমবার ভাড়া চাওয়া হয় ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা।

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী বলেন, দেশে ডিজেলের দাম বেড়েছে। আবার পাম্পে চাহিদা মতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে তো ট্রাকের ভাড়া বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ বলেন, তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও পরিবহন সংকটের জন্য ট্রাক ভাড়া এখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেকটা বাড়তি। ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করেন লাভের আশায় কিন্তু পরিবহন খরচ এত বেড়েছে যে এতে তাদের লোকসানে পড়তে হবে।

বাসভাড়ায় ফের বড় ঝটকা : রাতারাতি তৈরি হওয়া এই বাড়তি খরচের ধাক্কা এখন পরিবহন খাতের ওপর। এ পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন উঠেছে— বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত কে সামলাবেন; বাস-মালিক, নাকি সাধারণ যাত্রী?

পরিবহন মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, একটি সাধারণ ৪৫ সিটের দূরপাল্লার বাস গড়ে প্রতি লিটার ডিজেলে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার পথ চলে। আগে ১১৫ টাকা লিটার দরে প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি খরচ হতো ৩২ টাকা ৮৬ পয়সা। দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় এখন প্রতি কিলোমিটারে খরচ দাঁড়াচ্ছে ৩৮ টাকা ৫৭ পয়সায়। অর্থাৎ, প্রতি কিলোমিটারে বাসের শুধু জ্বালানি বাবদ খরচই বাড়ছে প্রায় ৫ টাকা ৭১ পয়সা। সে হিসাবে, ১০০ কিলোমিটার পথের জন্য আগে যেখানে ডিজেল বাবদ খরচ হতো ৩ হাজার ২৮৬ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩ হাজার ৮৫৭ টাকায়।

মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বাস মালিক মো. কামরুল ইসলাম বাবুল বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া নতুন করে সমন্বয়ের বিকল্প নেই। ১০০ কিলোমিটারে শুধু ডিজেলের পেছনেই অতিরিক্ত ৫৭১ টাকা খরচ পরিবহন মালিকদের চরম সংকটে ফেলেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি আলোচনা করছে এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘ডলারের দাম যখন ৮৬ টাকা ৩১ পয়সা ছিল, তখনকার হিসাব ধরে বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ডলারের দাম ১২৬ টাকায় উঠলেও ভাড়ার অন্যান্য উপাদানের খরচ সমন্বয় করা হয়নি। ফলে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই লোকসানে গাড়ি চালাচ্ছি। এখন আবার তেলের দাম বাড়ায় ছোট মালিকদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিয়মিত ভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছি। বিষয়টি সরকারকে বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে আমরা একটি সিদ্ধান্তের আশা করছি।’

দূরপাল্লার বাসে ভাড়া কিমিপ্রতি ২০ পয়সা, শহরে ১৮ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব : জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে বাসের ভাড়া বাড়ছে। দূরপাল্লার পথে কিলোমিটার প্রতি ২০ পয়সা এবং রাজধানীসহ শহরে ১৮ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এই প্রস্তাব সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বিআরটিএ সূত্র বলছে, ভাড়া কত বাড়বে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। এরপরই প্রজ্ঞাপন আকারে তা প্রকাশ করা হবে।

বাসের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি রয়েছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে অন্যান্য খরচ যুক্ত করা হয়। তবে এবার অন্যান্য খরচ যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের দাম যতটা বেড়েছে, ততটুকুই ভাড়া বাড়ানো হবে। সাধারণত, জ্বালানি তেলের দাম এক টাকা বাড়লে বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি বৃদ্ধি পায় এক পয়সা। এবার ডিজেলের মূল্য লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সোমবার বনানীতে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে বৈঠক হয়। এতে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এর আগে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা মন্ত্রণালয়ে সড়ক পরিবহন ও রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে দেখা করে ভাড়া বৃদ্ধির আবেদন জানান।

জ্বালানি তেলের দাম ৯ মাসে লিটারে বেড়েছে ৪৩ টাকা : চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। সবশেষ সোমবার থেকে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে। বৃদ্ধির এ হার সর্বোচ্চ প্রায় ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি লিটার ডিজেল ১০২ টাকা, কেরোসিন ১১৪ টাকা, পেট্রোল ১১৮ টাকা এবং অকটেন ১২২ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে সবশেষ নির্ধারিত দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা ও অকটেন ১৬৫ টাকা।

অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৩৩ টাকা বা ৩২ দশমিক ৩৫ শতাংশ, কেরোসিন ৪১ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, পেট্রোল ৪২ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ ও অকটেন ৪৩ টাকা বা ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়েছে।

টাকার হিসাবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অকটেনের দাম। প্রতি লিটারে এর দাম বেড়েছে ৪৩ টাকা। সব মিলিয়ে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের প্রধান চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৩২ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জ্বালানি তেলের দাম ছিল প্রতি লিটার ডিজেল ১০৯ টাকা, কেরোসিন ১০৯ টাকা, পেট্রোল ১২৫ টাকা ও অকটেন ১৩০ টাকা।

আরও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জ্বালানি তেলের দাম ছিল প্রতি লিটার ডিজেল ১০৫ টাকা, কেরোসিন ১০৫ টাকা, পেট্রোল ১২২ টাকা ও অকটেন ১২৬ টাকা।

গত ৯ মাসে যেভাবে বেড়েছে তেলের দাম : জানুয়ারি ২০২৬: বছরের শুরুতে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১০২ টাকা, কেরোসিন ১১৪ টাকা, পেট্রোল ১১৮ টাকা ও অকটেন ১২২ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ফেব্রুয়ারি মাস থেকে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২ টাকা করে কমানো হয়। এতে ডিজেলের দাম ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা ও অকটেন ১২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

মার্চ ২০২৬: মার্চ মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। ফলে ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা ও অকটেন ১২০ টাকা দরেই বিক্রি হয়।

এপ্রিল ২০২৬: এপ্রিলের প্রথম ১৮ দিন ফেব্রুয়ারি ও মার্চের নির্ধারিত দামই বহাল ছিল। এরপর ১৯ এপ্রিল থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। নতুন দরে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

মে ২০২৬: মে মাসে এপ্রিলের ১৯ তারিখ থেকে কার্যকর হওয়া দামই বহাল ছিল। অর্থাৎ, ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছে।

জুন ২০২৬: জুন মাসে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। ফলে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা ও অকটেন ১৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

জুলাই ২০২৬: জুলাই মাসে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। ফলে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা ও অকটেন ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হয়।

আগস্ট ২০২৬: আগস্ট মাসেও আগের মাসের দামই বহাল ছিল। অর্থাৎ, প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

সেপ্টেম্বর ২০২৬: সেপ্টেম্বরের শুরুতেও আগের চার মাসের দাম বহাল রাখা হয়। অর্থাৎ, ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা দরে বিক্রির সিদ্ধান্ত ছিল। সোমবার সেপ্টেম্বরের সবশেষ নির্ধারিত দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা হয়েছে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে। জিনিসপত্রের দামও সেই মাত্রায় বাড়বে। তাতে এখন যে মূল্যস্ফীতি আছে সেটি আরও বেড়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার যদি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তাহলে জিনিসপত্রের সরবরাহ বা সাপ্লাই বাড়াতে হবে। এখন এটি করতে গেলেও তো জিনিসপত্রের সরবরাহ খরচ বেড়ে যাবে। সুতরাং, শুধু এই কথা বললে হবে না যে জিনিসপত্রের পাল্টা উৎপাদন দিয়ে আমরা মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনবো। কারণ, পাল্টা উৎপাদনের উৎপাদন খরচও তখন বেড়ে যাবে। এজন্য শুধু পাল্টা উৎপাদন করেই হবে না, যদি না উৎপাদনশীলতা বাড়ে। তাই উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে খরচ কমাতে পারলে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে ফাইট করা যাবে।’

উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পুঁজি লাগবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যদি ঋণে সুদের হার কিছুটা কমিয়ে দেয় তাহলে ঋণ দিয়ে উৎপাদন করা যাবে। কিন্তু ঋণ নিয়ে যদি লুটপাট করে তাহলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এত কিছু করার পরেও অনেক লোক বেকার আছে এবং তাদের আয় নেই। তারা নিঃশেষ হয়ে যাবে। যারা আধা ডুবন্ত ছিল তারা ডুবে যাবে। গরিব আরও গরিব হবে। সেজন্য তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পরিচালক (পেট্রোলিয়াম) ও সরকারের যুগ্মসচিব ড. মো. দিদারুল আলম বলেন, ‘সরকার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রাইসিংয়ের অধীনে তেল দাম নির্ধারণ করে। এটা নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে। বিইআরসি শুধু বিদ্যুৎ, গ্যাস, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। হয়তো এছাড়া আর সরকারের কোনো উপায় ছিল না। এখন মুশকিলটা হচ্ছে এই সুযোগে পরিবহন খাতে অরাজকতা তৈরি হবে। এই সুযোগটা দেওয়া যাবে না।’

এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বাড়বে, তবে এটা বাড়তে কিছুটা সময় লাগবে। পরিবহন সেক্টরটা মনিটরিংয়ের অধীনে আনতে হবে। ট্রাম্প তো বলেছে... নভেম্বরের যুদ্ধ থেমে যাবে। তখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি শান্ত হলে হয়তো দাম কমবে। আমরা সেই আশা করব।’

পিপলসনিউজ/আরইউ

-- বিজ্ঞাপন --


CONTACT

ads@peoplenewsbd.com

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনজীবনে নানামুখী চাপ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনজীবনে নানামুখী চাপ হাম উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হাম উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আশুলিয়ায় গ্যাসের সিলিন্ডার বোঝাই গাড়িতে বিস্ফোরণ, নিহত বেড়ে ৮ আশুলিয়ায় গ্যাসের সিলিন্ডার বোঝাই গাড়িতে বিস্ফোরণ, নিহত বেড়ে ৮ এমপি গাজী নজরুল ও তার স্ত্রী এক দিনের রিমান্ডে এমপি গাজী নজরুল ও তার স্ত্রী এক দিনের রিমান্ডে