ডাকসু নির্বাচন: প্রচারণায় উৎসবমুখর ক্যাম্পাস
প্রকাশ : ২৭-০৮-২০২৫ ১১:০৯

ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। ভোটগ্রহণের দিন তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার সর্বোচ্চ স্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি প্রবেশমুখে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে।
এবারের নির্বাচনে মোট ২৮টি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ৪৭১ জন প্রার্থী। ইতোমধ্যেই নির্বাচনী প্রচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলগুলো।
জানা যায়, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রথম স্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি ও প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা, দ্বিতীয় স্তরে পুলিশ ও তৃতীয় স্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি প্রবেশ মুখে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে অবস্থান নেবে সেনাবাহিনী।
মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ডাকসু ও হল সংসদের প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার মতবিনিময় সভা শেষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।
মতবিনিময় সভায় ডাকসুর সব প্রার্থী ও হল পর্যায়ের সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় ডাকসু নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক গোলাম রব্বানী, অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম, অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা, অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা, অধ্যাপক তারিক মনজুর, সহযোগী অধ্যাপক শারমীন কবীর এবং হল রিটার্নিং কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলাসহ সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে রিটার্নিং কর্মকর্তারা দিকনির্দেশনা দেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বরাত দিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। ইতোমধ্যে টহল টিমসহ সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো সক্রিয় রয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবে। ভোট শেষে ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র সেনাসদস্যরা ঘিরে রাখবেন। ভোট গণনার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো প্রবেশের সুযোগ থাকবে না।
আবাসিক হলগুলোর বিষয়ে বলা হয়, নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকে আবাসিক হলে কোনো বহিরাগত থাকতে পারবে না। নিয়মিত টহল পরিচালনার মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। তবে ছাত্রীদের হলগুলোতে কখনোই বহিরাগত ব্যক্তিরা থাকতে পারেন না।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, নির্বাচনের আগের দিন (৮ সেপ্টেম্বর) ও নির্বাচনের দিন (৯ সেপ্টেম্বর) মেট্রোরেলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বন্ধ থাকবে। নির্বাচনের দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পুরোপুরি সিলগালা থাকবে। বৈধ শিক্ষার্থী, অনুমোদিত সাংবাদিক ও নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। যেসব শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন, তাদের ভোটদানের জন্য বিভিন্ন রুটে বাসের অতিরিক্ত ট্রিপের ব্যবস্থা করা হবে। এসব বাস নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
২৮ পদে লড়বেন ৪৭১ জন: ডাকসু নির্বাচনে ২৮ পদে প্রার্থী হয়েছেন মোট ৪৭১ জন। এর মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচন করছেন সর্বাধিক ৪৫ জন। এ ছাড়া সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৯ জন ও সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ২৫ জন প্রার্থী হয়েছেন। তফসিল অনুযায়ী প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন মঙ্গলবার ডাকসু নির্বাচনের চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক জসিম উদ্দিন এসব তথ্য জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ডাকসু নির্বাচন-২০২৫-এ সর্বমোট ৪৭১ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
তার দেওয়া তথ্যমতে, ডাকসুর ২৮ পদের শীর্ষ তিন পদ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে ১৭ জন; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ১২; কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ১১ জন; আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ১৪ জন; সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ১৯; গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ৯ জন; ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১৩; ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ১২; সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৭ জন; ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক পদে ১৫; স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ১৫; মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সম্পাদক পদে ১১ জন প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া ১৩ সদস্য পদের বিপরীতে লড়বেন ২১৭ জন।
গেল ১৯ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিন পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচনে মোট ৫০৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। তাদের মধ্যে ৩৮ জন বাছাইয়ে বাদ পড়েন।
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভিপি-জিএসসহ সম্পাদকীয় ১৫টি পদের একটি ছাড়া বাকিগুলোতে ৬২ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আন্তর্জাতিক ও ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে কোনো নারী শিক্ষার্থী প্রার্থী হননি।
চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, ভিপি পদে পাঁচজন, জিএস পদে একজন, এজিএস পদে চারজন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন পদে দুইজন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে একজন, কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে নয়জন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে তিনজন, ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক পদে দুইজন, সমাজসেবা সম্পাদক পদে একজন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে একজন, গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে তিনজন, সাহিত্য ও সংস্কৃতিক পদে দুইজন, মানবাধিকার ও আইন সম্পাদক পদে তিনজন ভোটের জন্য লড়বেন।
এ ছাড়া ১৩টি সদস্য পদে ২৫ জন নারী শিক্ষাথী প্রার্থী হয়েছেন। এবার আট ভোট কেন্দ্রে ভোট দেবেন শিক্ষার্থীরা। তবে ৩৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য আট ভোট কেন্দ্র পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছে বিভিন্ন প্যানেল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, আমরা এর আগে ভোট কেন্দ্রগুলো ভিজিট করেছি, তারপরই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সব ভোট কেন্দ্র হিসাব-নিকাশ করেই আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা এখন পর্যন্ত মনে করি, এটা পর্যাপ্ত। সামনে যদি প্রয়োজন মনে হয়। আমরা ব্যবস্থা করবো।
প্রচারণায় সরগরম ক্যাম্পাস: ডাকসু নির্বাচনের গণসংযোগ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিরোধ পর্ষদের ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু এবং এজিএস প্রার্থী মো. জাবির আহমেদ জুবেলের নেতৃত্বে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে পর্ষদের নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রতিরোধ পর্ষদের প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনে নির্বাচনী জনসংযোগ শুরু করেন। এরপর তারা কার্জন হল এলাকায় জনসংযোগ করবেন বলে জানিয়েছেন।
এ ছাড়া দুপুরের দিকে জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা, জিএস প্রার্থী আল সাদী ভূঁইয়াসহ প্যানেলের অন্য সদস্যরা।
সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ নামে একটি স্বতন্ত্র প্যানেল সকালে ক্যাম্পাস এলাকায় গণসংযোগ শুরু করে। এই প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী হয়েছেন মো. জামাল উদ্দীন খালিদ।
এ ছাড়া দুপুরের দিকে সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে থেকে কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ডাকসু নির্বাচনের প্রচার শুরু করেন। তাদের মধ্যে আছেন এজিএস প্রার্থী তাহমীদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী, ক্রীড়া সম্পাদক প্রার্থী জহিন ফেরদৌস জামি ও স্বতন্ত্র সদস্য প্রার্থী সরদার নাদিম মাহমুদ শুভ।
তবে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক থাকায় মাঝে কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে দুপুরের পর আবারো প্রার্থীরা গণসংযোগ শুরু করেন।
এদিকে মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রার্থীদের কাছে আচরণবিধি ব্যাখ্যা করেন নির্বাচন কমিশনার। সেখানে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ সমর্থিত প্যানেল এবং অন্যান্য স্বতন্ত্র প্যানেল ও প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাদা কালো পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ছাপানো ও বিলি করা যাবে। পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিলে কোনো প্রার্থী নিজের সাদাকালো ছবি ছাড়া অন্য কারো ছবি বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে হলগুলোয় প্রচার চালানো যাবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হল এলাকায় অবস্থিত কোনো প্রকার স্থাপনা, দেয়াল, যানবাহন, বেড়া, গাছ-পালা, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি বা অন্য কোনো দণ্ডায়মান বস্তুতে পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল লাগানো যাবে না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিলের ক্ষতিসাধন করা যাবে না।
আরো বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কোনো ছাত্র সংগঠন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো কালি বা চুন বা কেমিক্যাল দিয়ে দেয়াল বা যানবাহনে কোনো লিখন, মুদ্রণ, ছাপচিত্র বা চিত্রাঙ্কন করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবে না।
আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ছাত্রী হলগুলোয় স্ব হলের অনাবাসিক এবং অন্য ছাত্রী হলের আবাসিক ও অনাবাসিক ছাত্রী যারা প্রার্থী, তারা নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন। ২৬ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ছাত্রী হলে প্রচারণা চালানো যাবে। আর ছাত্র হলে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত প্রচারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রচারকাজ চালানোর নির্ধারিত দিনগুলোয় সামাজিক, আর্থিক ও সেবামূলক সহযোগিতা বা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে না।
এ ছাড়া প্রার্থীদের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে বা হলে মাজলিস-মাহফিল আয়োজন করা কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রচার চালানোর যাবে না। এগুলো নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে এবং এক্ষেত্রে ‘নির্বাচন আচরণ বিধিমালা’ ধারা-১৭ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হবে।
চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, ভোট দেওয়ার সময় হলে কার্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড, লাইব্রেরি কার্ড অথবা পে-ইন স্লিপ প্রদর্শন করে ভোট দেওয়া যাবে।
ভোটকেন্দ্র বাড়ানোর দাবি ডাকসু ভিপিপ্রার্থী আবিদের: ডাকসু নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ছাত্রদলের মনোনীত ভিপিপ্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান। আবিদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ব্যবস্থায় সব শিক্ষার্থীর ভোটাধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ সম্ভব হবে না।
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের তৃতীয় তলায় নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই অভিযোগ করে কেন্দ্র বাড়ানোর দাবি জানান।
আবিদ বলেন, ডাকসু নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি শুনিয়েছে, কিন্তু প্রার্থীদের মতামত গ্রহণ করেনি। প্রায় ৪০ হাজার ভোটারের জন্য মাত্র আটটি কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। ডাকসু ও হল সংসদ মিলিয়ে প্রতিজনকে ৪১টি ভোট দিতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ। এক ঘণ্টায় একটি বুথে সর্বোচ্চ ৪০-৫০ ভোট দেওয়া সম্ভব। যদি ২০টি বুথ থাকে, তবু দিনে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ ভোটের বেশি কাস্ট সম্ভব নয়। এ অবস্থায় আটটি ভোটকেন্দ্র দিয়ে কোনোভাবেই সব শিক্ষার্থীর ভোট নিশ্চিত করা যাবে না।
তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্র না বাড়ালে ২০১৯ সালের মতো আবারো অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ফেক লাইন তৈরি হতে পারে। ভেতরে ছাত্রলীগ দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা ঢুকতে পারেননি। এবারো অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা যদি দেরিতে আসেন, তবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা সম্ভব হবে না।
ভোটের বিষয়টি যদি ‘স্ক্যাম’ হয়, নির্বাচনে নাও থাকতে পারি-মেঘমল্লার বসু: ডাকসু নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনেকগুলো বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেল। এ প্যানেলের জিএস (সাধারণ সম্পাদক) প্রার্থী মেঘমল্লার বসু বলেন, ভোটের বিষয়টি যদি ‘স্ক্যাম’ মনে হয়, তাহলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন তারা।
ডাকসু নির্বাচনের প্রচারণায় প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ কিছু বিষয়ে প্যানেলের অবস্থান জানাতে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মেঘমল্লার বসু এসব কথা বলেন।
এই জিএস প্রার্থী বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গেই আছি এবং আমাদের যে প্রচারণা, তা পূর্ণভাবে চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা যদি বুঝতে পারি, এখানে পুরো ভোটের বিষয়টি একটি স্ক্যাম (জালজালিয়াতি) এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ন্যূনতম মেরুদণ্ড নেই, সে ক্ষেত্রে আমরা নির্বাচনে নাও থাকতে পারি।
ডাকসুর আচরণবিধিকে কৌতুক মন্তব্য করে মেঘমল্লার বসু বলেন, আমরা ছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো প্যানেল ডাকসুর আচরণবিধি মেনে চলেনি। আমরা দেখতে পেয়েছি, অনেক প্রার্থী রিডিংরুম (পাঠকক্ষ) পর্যন্ত চলে গেছেন। অনেকে দোয়া চাওয়ার কথা বলে পূর্ণরূপে প্রচারণা চালিয়েছেন। এই আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে বারবার বলা হলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
প্রতিরোধ পর্ষদের জিএস প্রার্থী বলেন, গত সাত দিনে কী পরিমাণ খাওয়াদাওয়া হয়েছে, তা আপনারা একটু খেয়াল করবেন। খাওয়ানোর পর প্রার্থী নিজে টাকা দেন না, তার সঙ্গে থাকা অন্য একজন টাকা দেন। এভাবে প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের একধরনের ঘুষের মাধ্যমে ভোট টানার চেষ্টা হচ্ছে।
প্রচারণার প্রথম দিনেই দুর্বৃত্তায়নের শিকার শিবির ও নারী প্রার্থী: ডাকসু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিনেই দুর্বৃত্তায়নের শিকার ইসলামী ছাত্র শিবির ও একজন নারী প্রার্থী।
মঙ্গলবার ঢাবির চারুকলা অনুষদে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটে’র ফেস্টুন ফেলে দেওয়া হয়েছে ও হিজাব পরিহিত নারী প্রার্থীর মুখ কালি দিয়ে বিকৃত করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এদিন সকালে চারুকলা অনুষদে ছাত্রশিবির তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের ছবি সম্বলিত ফেস্টুনটি টানানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ফেলে দেওয়া হয়। যদিও এই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ডাকসুর আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচার সামগ্রী যেমন পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিলের কোনো ক্ষতি করা যাবে না।
এ প্রসঙ্গে ঢাবি শাখা শিবিরের সভাপতি এবং জিএস (সাধারণ সম্পাদক) প্রার্থী এস এম ফরহাদ বলেন, আমরা এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানাব। এটি ছাত্রলীগের কাজও হতে পারে অথবা অন্য কারো কাজ হতে পারে।
সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ফরহাদ। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। নির্বাচন কমিশনকেই খুঁজে বের করতে হবে কারা এই কাজ করছে। তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী বলেন, আমরা এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ছাত্রশিবিরের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি ‘অপরাজেয়-৭১’ প্যানেলের: ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানিয়েছে তিন বাম সংগঠনের প্যানেল ‘অপরাজেয়-৭১ ও অদম্য-২৪’। এ প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী এনামুল হাসান অনয় বলেন, একাত্তরের ও চব্বিশের পরাজিত শক্তি ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগের প্রার্থিতা বাতিল করা হোক। তাদের নির্বাচন করতে দেওয়া মানে এ দেশের মা-মাটি ও মানুষের সঙ্গে একটা সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করা। মঙ্গলবার মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছিলেন অনয় ও তাদের প্যানেলের প্রার্থীরা।
অনয় বলেন, আজকে প্রশাসন মিটিং বলে আমাদের ডাকল। কিন্তু তারা একচেটিয়া কথা বলে চলে গেছে। আমাদের দাবি দাওয়া শুনল না। তাই আজকের এ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রশাসনের কাছে চার দফা দাবি জানাই।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের একাংশ ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএল (বাংলাদেশ জাসদের ছাত্র সংগঠন) সমর্থিত ‘অপরাজেয়-৭১ ও অদম্য-২৪’ প্যানেলের সহ-সভাপতি মো. নাইম হাসান হৃদয়ও চার দাবি তুলে ধরেন সংবাদ সম্মেলনে।
পিপলসনিউজ/আরইউ
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@peoplenewsbd.com