ছিনতাইয়ের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন বনশ্রীর সেই স্বর্ণ ব্যবসায়ী
প্রকাশ : ২৪-০২-২০২৫ ২০:৫৪

ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর বনশ্রীর ডি ব্লকের সাত নম্বর রোডে আনোয়ার হোসেন (৪৩) নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গুলি করে তার সঙ্গে থাকা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও নগদ এক লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ডি ব্লকের ২০ নম্বর বাসার সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত ব্যবসায়ী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দারোয়ান স্ত্রী যদি গেট খুলে দিত তাহলে এই গুলির ঘটনা ঘটতো না। এদিকে পুলিশ বাড়ির দারোয়ানকে আটক করে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। অন্যদিকে ওই এলাকার অন্যান্য স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তা চেয়ে মানববন্ধন করেছেন। সবশেষ সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে রামপুরা থানায় আনোয়ারের স্ত্রী হোসনেয়ারা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত ছয় থেকে সাত জনকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফেরার পথে আমার বন্ধুর দোকানে দাঁড়াই। সেখানে পাঁচ মিনিট তার সঙ্গে কথা বলে বাসার উদ্দেশে রওনা হই। আমার বাসার সামনে গিয়ে মোটরসাইকেলটি দাঁড় করাই। আমি দারোয়ানকে গেট খুলতে বলি। এর মধ্যে তিনটা হোন্ডা এসে আমাকে ঘেরাও করে ফেলে। এটি দেখে দারোয়ানের বউ গেট লাগিয়ে দেয়। তখনো তারা আমাকে গুলি বা কুপিয়ে আহত করেনি। আমি দারোয়ানকে বারবার গেট খুলতে বলি কিন্তু সে গেট খুলেনি। ভিডিওতে এসেছে- তখন তারা আমার ব্যাগ নিয়ে টানাটানি করছিল। পরে আমাকে কুপিয়ে এবং গুলি করে আমার ব্যাগে থাকা ১৪০ ভরির মতো স্বর্ণ ও নগদ এক লাখ টাকা নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, দারোয়ানের স্ত্রী গেট খুলে দিলে আমি কিন্তু বাসার ভেতরে ঢুকে যেতে পারতাম। তাহলে তারা আমার ব্যাগ এবং টাকা কিছুই নিতে পারত না। আমাকে গুলি ও কুপিয়ে জখমও করতে পারত না।
আহত স্বর্ণ ব্যবসায়ী আরো বলেন, ব্যাগ দিতে না চাওয়ায় তারা আমাকে কুপিয়ে জখম করে। তিনটি গুলি করে। আমার দুই পায়ে দুটি গুলি করে। অন্ডকোষের নিচে একটি গুলি লাগে। তবে এখন পর্যন্ত চিকিৎসক জানিয়েছেন- আমার শরীরে কোনো গুলি নেই এবং অণ্ডকোষের একটি অপারেশন হবে। শরীরের যে কয়েকটি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে সেগুলোর অপারেশন করা হয়েছে।
আনোয়ার হোসেন বলেন, এক সপ্তাহ আগে ডিবি পরিচয় দিয়ে আমাকে নানাভাবে ভয় ভীতি দেখায় দুর্বৃত্তরা। আমাকে বলেছিল আমি নাকি অবৈধ স্বর্ণ কিনি। আমার নামে নাকি মামলা আছে। এসব কথা বলে তারা আমার কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা নেয়। পরে তাদের আরো ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। তখন আমি তাদের ফোন দেই যে ভাই সরাসরি এসে ১০ হাজার টাকা নিয়ে যান। তখন ওই ব্যক্তি ফোনের ওপার থেকে জানায়- ‘আমি ঢাকার বাইরে আছি, পরে এসে দেখা করব।’ এরপর আমি আবার ফোন দিলে অপর প্রান্ত থেকে বলেছিল- ‘ভাই আমার সিমটি হারিয়ে গিয়েছিল ওই লোকটি প্রতারক ছিল’।
তিনি বলেন, আমাকে তিনটি নম্বর থেকে ফোন দিয়েছিল সে নম্বরগুলো হলো- ০১৯৪১৮৯৫৫২০, ০১৭০৭২২৯০৯৫, ০১৮৪৬৭৪০৭৪৭।
আনোয়ার হোসেনের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ঢামেকের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, রোগীকে দেখে আসলাম। বর্তমানে সে হাসপাতালের ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের দুই নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন আছে। তার কাঁধে একটি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যার কারণে তিনি ওই হাতটি এখন নড়াচড়া করতে পারছেন না। তবে সেখানে অপারেশন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এক্স-রে করে আমরা তার শরীরের ভেতরে গুলি আছে সেটি এখনো দেখতে পাইনি। ধারণা করছি, তার অণ্ডকোষে একটি গুলি লেগেছে। সেটির অপারেশন করা হবে। আবারো তার অণ্ডকোষ ও কোমরে এক্স-রে করা হবে। তাহলে বলা যাবে সম্পূর্ণভাবে যে তার শরীরে কোনো গুলি এখনো আছে কি নেই। তবে তিনি এখন সুস্থ আছেন। আশঙ্কার কোনো কিছু নেই।
মামলা, আসামি ৭ জন: স্বর্ণ ও টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা করেছেন আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী হোসনেয়ারা। মামলায় ছয় থেকে সাত জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমবার রামপুরা থানায় মামলাটি করা হয়।
ওসি আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী হোসনেয়ারা বাদী হয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগটি এজাহার হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এজাহারে ছয় থেকে সাত জনকে অজ্ঞাত হিসেবে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৬০ ভরি স্বর্ণ ও নগদ এক লাখ টাকা ডাকাতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে।
বাসার নিরাপত্তাকর্মী আটক: বনশ্রীতে ব্যবসায়ীর স্বর্ণ ও নগদ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সেখানকার একটি বাসার নিরাপত্তাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, বাসায় প্রবেশের সময় স্বর্ণ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনকে গুলি করে স্বর্ণালংকার ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। এসময় নিরাপত্তাকর্মীকে গেট খোলার কথা বললেও তিনি খোলেননি। তিনি কেন গেট খোলেননি এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে থানায় আনা হয়েছে।
আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, ওই ব্যবসায়ীর দোকান বনশ্রী ডি ব্লকে। প্রতিদিন তিনি দোকান থেকে রাতে বাসায় ফেরেন। রবিবার বাসায় যাওয়ার সময় তাকে তিনটি মোটরসাইকেলে করে আসা ছিনতাইকারীরা ঘিরে ধরে। তিনি আরো বলেন, এ ঘটনায় এখনো কাউকে আটক বা চিহ্নিত করা যায়নি। তবে পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে গিয়েছে এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছে। ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য কাজ করছে পুলিশ।
নিরাপত্তা চাইলেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা: বনশ্রী এলাকায় স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গুলি করার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে মানববন্ধন করেছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। সোমবার ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন ও সড়কে অবস্থান নেন। পরে পুলিশের আশ্বাসে সড়ক ছেড়ে দেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে ব্যবসায়ী আনোয়ারকে গুলি করে ছিনতাইয়ের ঘটনার পর সোমবার সকাল থেকে বনশ্রী এলাকার তার বাড়ির সামনে ভিড় করেন স্থানীয় মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায় সেনাবাহিনী। এ সময় সেনাবাহিনীর কাছে নিরাপত্তা চান তারা।
পিপলসনিউজ/আরইউ
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@peoplenewsbd.com