সপ্তাহ পর সচল তিতুমীর কলেজ
প্রকাশ : ০৪-০২-২০২৫ ২৩:৪৬

ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে সরকারি তিতুমীর কলেজে সচল হয়েছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। মঙ্গলবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দিনভর চলে কলেজের সব কার্যক্রম। এর আগে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিতে কয়েকদিনের আমরণ অনশন, অবরোধ, শাট ডাউন ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পলান করেন তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল থেকেই শুরু হয় প্রশাসনিক কার্যক্রম। এরপর সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত হয়েছে স্নাতক-স্নাতকোত্তর শ্রেণির ক্লাস। তবে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সংখ্যা ছিল অন্য সময়ের তুলনায় কিছুটা কম। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন সাত কলেজের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা।
তিতুমীরকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণাসহ সাত দাবিতে গত মঙ্গলবার থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে কর্মসূচি শুরু করছিলেন এ কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরদিন বিকালে শুরু হয় অনশন। সোমবার শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আশ্বাস দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের কোনো সুস্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়নি।
তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট আশ্বাসে তারা ক্লাসে ফিরেছেন। যার বাস্তবায়ন দেখাতে হবে আগামী সাত দিনের মধ্যে। এরমধ্যে যদি প্রতিশ্রুত বিষয়গুলো নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হয় তাহলে আবারো আন্দোলনের ডাক আসতে পারে।
সাম্প্রতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া অন্যতম শিক্ষার্থী নায়েক নূর মোহাম্মদ বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসে আপাতত সাত দিন কর্মসূচি স্থগিত থাকবে। এ সময়ে ক্লাস-পরীক্ষা সবই চলবে। আলোচনা সভায় সরকারের পক্ষ থেকে যে-সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলো কতটা দৃশ্যমান হবে তা বিবেচনা করেই পরবর্তীতে কর্মসূচি দেওয়া হবে। কারণ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বৈঠকে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতির দাবি বাস্তবায়নে তিতুমীর কলেজ শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত সরকার গঠন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তিনি আরো বলেন, বৈঠকে আমরাও কিছু দাবি জানিয়েছি। যা পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রোহান হোসেন বলেন, আশা করি সরকার অবশ্যই দাবি মেনে নেবে। না মানলে আবার আন্দোলন। পড়াশোনার পরিবেশ চাই আমরা, আর ঝামেলা চাচ্ছি না।
ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরলেও তুলনামূলকভাবে উপস্থিতি কম। প্রথম ছিল তো তাই। পরে হয়তো বাড়বে। দাবি পূরণ না হলে সমন্বয়করা হয়ত নতুন কোনো কর্মসূচি দেবে, সেটির সঙ্গে আমাদের একাত্মতা থাকবে।
আশিকুর রহমান অন্ত বলেন, ঘোষণার পরই ক্লাস। আশ্বাসের ব্যপারে আশাবাদী হয়ে ক্লাসে ফিরেছি। সবাই মিলেই ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত ছিল।
কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক শিপ্রা রাণী মণ্ডল বলেন, সম্প্রতি শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছেন। সোমবার রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর যাবতীয় কর্মসূচি স্থগিত করে মঙ্গলবার ক্লাসে ফিরেছেন। আমরা আশা করছি, সামনে আর এমন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখোমুখি আমাদের হতে হবে না।
গত ২৬ জানুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে সাত কলেজকে মুক্ত করার ঘোষণা দেন।
এই সাত কলেজ নিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছে সরকার। তবে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা চাইছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানটিকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়া হোক।
ওই দাবিসহ সাত দাবিতে মঙ্গলবার থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছিলেন তিতুমীরের শিক্ষার্থীরা। পরদিন বিকাল থেকে ‘তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে আমরণ অনশন’ লেখা ব্যানার টাঙিয়ে কলেজের মূল ফটকের সামনে অনশন শুরু করেন তাদের কয়েকজন। আর বৃহস্পতিবার থেকে বিরতি দিয়ে চলছিল সড়ক অবরোধ কর্মসূচি, যাকে তারা বলছেন, ‘বারাসাত ব্যারিকেড টু নর্থ সিটি’।
আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম ‘তিতুমীর ঐক্যর’ সাত দফার মধ্যে রয়েছে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রকাশ; ‘বিশ্ববিদ্যালয়’প্রশাসন গঠন করে ২৪-২৫ সেশনের ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা এবং শতভাগ শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা কিংবা শতভাগ শিক্ষার্থীর আবাসিক খরচ বহন করা।
এসব দাবিদাওয়া নিয়ে সোমবারও সড়ক অবরোধের পর মহাখালীতে রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। ফলে দিনভর সড়কে যানজটের পাশাপাশি ট্রেন বন্ধে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। ক্ষোভে পরে যাত্রীরা কমলাপুর রেলস্টেশনের ম্যানেজারকে অবরুদ্ধ করেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে রাতে কলেজটির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। পরে রাত সোয়া ৯টায় কর্মকর্তারা মহাখালী রেলক্রসিংয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে যান।
অনশনরত শিক্ষার্থীদের জুস খাইয়ে অনশন ভাঙান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. নুরুজ্জামান ও কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শিপ্রা রাণী মণ্ডল।
কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের সুস্পষ্ট ঘোষণা না দিলেও শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আশ্বাস দেন যুগ্মসচিব মো. নরুজ্জামান।
তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি কোন কাঠামোতে হবে তা আলোচনা করে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা দ্রুত ওই সিদ্ধান্ত জানাব। জমি বরাদ্দ, নতুন বিল্ডিং ইত্যাদি শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল। কলেজের পাশে টিএনটি ও রাজউকের জমি আছে। সেগুলো যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তিতুমীরকে দিতে পারলে সেখানে আবাসন সংকট মেটানো সম্ভব। আবাসন ও পরিবহন সংকট নিরসনে কার্যক্রম গ্রহণ করে আগামী সাত দিনের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি জানাব। শিক্ষা মান বাড়াতে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমানোর দাবির বিষয়ে আমরা ইউজিসির সঙ্গে আলোচনা করব।
তিতুমীর কলেজের আইন ও সাংবাদিকতা বিভাগ চালুর দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা ক্যাডারে এ সাবজেক্ট নাই। এ দাবিটি আরো পর্যালোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
শিক্ষক সংকট নিরসনের আশ্বাস দিয়ে নুরুজ্জামান বলেন, আমরা আগামী সাত দিনের মধ্যে কলেজের পিএইচডি ডিগ্রিধারী ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পোস্টিংয়ের ব্যবস্থা করব। ১৫২ জন শিক্ষকের পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া ছিল। এটি আরো ত্বরান্বিত করতে আমরা উদ্যোগ নেব। তাদের আবাসনের ক্রাইসিস ও শিক্ষা মান বৃদ্ধির জন্য প্রিন্সিপাল মহোদয়ের নেতৃত্বে ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে একটি টিম গঠন করা হবে। তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। তারা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে আমাদের জানাবেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে যুগ্মসচিব বলেন, সেমিস্টার সিস্টেমে পড়াশোনার কথা তোমরা বলছ। সেটি যদি সম্ভব হয়, আমরা পর্যালোচনা করব। ইউজিসি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে যে কমিটি হয়েছে তাদের কাছে আমরা এ প্রস্তাব রাখব। আমরা আশা করি সবাই মিলে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব।
পিপলসনিউজ/আরইউ
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@peoplenewsbd.com