weather ২৭.৯৯ o সে. আদ্রতা ৮৯% , শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

৬০১ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্প চার বছরেই বসবাসের অনুপযোগী!

প্রকাশ : ১১-০৮-২০২৫ ১৬:৩৯

ছবি : সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন ১০টি বহুতল ভবনে ৭৩৬টি আবাসিক ফ্ল্যাট। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল ৬০১ কোটি টাকা। উদ্বোধনের পর চার বছর পেরিয়ে যেতেই ফ্ল্যাটগুলো ক্রমশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেখানে থাকতে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছেন, অনেক ফ্ল্যাট খালি পড়ে আছে, আবার কিছু ফ্ল্যাট নিয়ম ভেঙে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি ব্যক্তিদের কাছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে— কোথাও ভবনের দেয়ালে ফাটল, কোথাও টোকা দিতেই খসে পড়ছে প্লাস্টার। কিছু ফ্ল্যাটের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি চুঁইয়ে পড়ছে, দেয়াল স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছে, রান্নাঘর ও বাথরুমের টাইলস উঠে যাচ্ছে, টয়লেটের পাইপ ক্ষয়ে গেছে, এমনকি বেসিন পর্যন্ত খুলে পড়ছে। অথচ এই ভবনগুলো তৈরি হয়েছিল ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে। নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন দুর্নীতির দায়ে বর্তমানে কারাবন্দী ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম, ওরফে জি কে শামীম এবং তার সহযোগীরা।

ভেতরের করুণ অবস্থা: প্রকল্পের প্রধান গেটের ভাঙা নামফলক পেরিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে নিরাপত্তাপ্রহরীর কক্ষ, পাশে মসজিদ, আর তার পরপরই সারিবদ্ধ উঁচু ভবন। ভবনের আশপাশ অপরিচ্ছন্ন, ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা, রাস্তা ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে। দুটি খেলার মাঠ থাকলেও কোথাও নেই সঠিক বাউন্ডারির তারের জয়েন্ট, লাইটগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

এক নম্বর ভবনে ঢুকতেই দেখা যায়— নিচতলার সামনের টাইলস ভাঙা, দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে, নানা জায়গায় ফাটল। নিরাপত্তাপ্রহরীর আপত্তি সত্ত্বেও বাসিন্দারা কয়েকটি ফ্ল্যাট দেখান— কোথাও শয়নকক্ষের দেয়াল আর্দ্রতায় ভিজে ড্যাম্প, কোথাও বাথরুমের টাইলস উঠে গেছে। একই অবস্থা দুই ও তিন নম্বর ভবনের ফ্ল্যাটগুলোরও।

তিন নম্বর ভবনের তত্ত্বাবধায়ক কাজী ইমরান বলেন, এখানে মূলত এনএসআই কর্মকর্তারা থাকেন। নির্মাণকাজ এত নিম্নমানের ছিল যে দেয়ালে সামান্য আঘাত করলেই প্লাস্টার খসে পড়ে। দরজার লক নষ্ট, ৮০ শতাংশ লাইট অকার্যকর। মাত্র কয়েক দিন আগে ১১ তলার একটি ফ্ল্যাটের বেডরুমের প্লাস্টার খুলে পড়েছে, বাথরুম ও রান্নাঘরের অবস্থা আরো শোচনীয়। তার ভাষায়, এখানে কী পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে, তা খালি চোখেই বোঝা যায়।

চার নম্বর ভবনে গিয়ে দেখা গেল পয়োনিষ্কাশন পাইপের অংশ খোলা, রেলিঙ ভাঙা। পাঁচ নম্বর ভবনের বাথরুমের টাইলস উঠে গেছে, বেডরুমের দেয়াল ভিজে ড্যাম্প হয়ে আছে। ছয় নম্বর ভবনের নিচতলার টাইলস গুঁড়া হয়ে গেছে। এই ভবনের বাসিন্দা আশিক রাব্বানী বলেন, প্রতিটি ফ্লোরের প্লাস্টার খুলে পড়ছে, এমনকি বাসার বেসিনও খুলে পড়ে। এত বড় প্রকল্পে এত অনিয়ম হয়েছে যে তা মেরামত করতেই বিপুল অর্থ লাগবে।

নয় নম্বর ভবনের রান্নাঘরের টাইলস খসে পড়েছে, বেডরুমের দেয়াল ভিজে একেবারে আর্দ্র হয়ে গেছে। পাঁচ ও ছয় নম্বর ভবনের বাসিন্দা রবিন হাসান ও সুজন কৈরির অভিযোগ, নষ্ট ফ্ল্যাটগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না, অথচ দ্রুত মেরামত জরুরি।

সরকারি প্রতিবেদনে অনিয়মের প্রমাণ: বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) গত জুলাইয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রকল্পের অন্তত ২৫ শতাংশ ফ্ল্যাটের বাথরুমের দেয়ালে আর্দ্রতা, ১০ শতাংশ ফ্ল্যাটের টাইলস উঠে গেছে, আর ২০ শতাংশের বেডরুম ও ড্রয়িংরুমে প্লাস্টার খসে পড়ছে। লিফট ও ওয়াটার পাম্প অকার্যকর, ইন্টারকম ও সিসিটিভি ক্যামেরা অপ্রতুল, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র মেয়াদোত্তীর্ণ। ৭০ শতাংশ ভবনে ইন্টারকম নেই, যেখানে আছে সেখানেও তা সচল নয়। সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো থাকলেও ৩ ও ১০ নম্বর ভবন ছাড়া বাকি সব ভবনের ক্যামেরা অকার্যকর। জেনারেটর থাকলেও ৭০ শতাংশ ভবনে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয় না।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজালে (ডিপিপি) এক কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি জিপ গাড়ি ও তিনটি মোটরসাইকেল কেনা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে এসব যানবাহনের কোনো হদিস নেই।

দায় এড়ানোর প্রবণতা: প্রকল্পের সর্বশেষ পরিচালক ও সাবেক সাভার গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শংকর কুমার মালো দাবি করেন, নির্মাণের আগে সব উপকরণ বুয়েট থেকে পরীক্ষা করা হয়েছিল। তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে মিস্ত্রিদের ত্রুটির কারণে পানির লাইনে লিক হচ্ছে ও আর্দ্রতায় প্লাস্টারের ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে, আইএমইডির সচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, আমাদের প্রতিবেদন শুধু অনিয়মের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে; প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সাভার গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান জানান, দুই মাস অন্তর সমস্যাগুলো নিয়ে সভা হবে এবং সেই পরামর্শ অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, সরকারি নির্মাণ প্রকল্পে সাধারণত ওভারপ্রাইসিং করে অতিরিক্ত মূল্য ধরা হয়, আর এই প্রকল্পে শুধু দাম বাড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি— নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারও করা হয়েছে। তার মতে, প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, আর ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্পে যেন এমন অনিয়ম না হয়, সেজন্য অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে নজরদারি বাড়াতে হবে।

পিপলসনিউজ/আরইউ

-- বিজ্ঞাপন --


CONTACT

ads@peoplenewsbd.com

কাকরাইলে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ কাকরাইলে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ আদালতের প্রতি আস্থা নেই বলে জামিন চাননি লতিফ সিদ্দিকী আদালতের প্রতি আস্থা নেই বলে জামিন চাননি লতিফ সিদ্দিকী ‘এবারের নির্বাচন হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ’ ‘এবারের নির্বাচন হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ’ পদচ্যুত হতে পারেন থাইল্যান্ডের বরখাস্ত প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা পদচ্যুত হতে পারেন থাইল্যান্ডের বরখাস্ত প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী, শিক্ষক হাফিজুরসহ ১৬ জন কারাগারে সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী, শিক্ষক হাফিজুরসহ ১৬ জন কারাগারে